রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে আবারও সামনে এসেছে চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির অভিযোগ। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina), তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় (Sajeeb Wazed Joy) এবং যুক্তরাজ্যে বসবাসরত ভাগনি টিউলিপ সিদ্দিক (Tulip Siddiq)-এর বিরুদ্ধে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এই বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতে সহযোগিতার অভিযোগে নাম এসেছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটেম (Rosatom)-এর, যদিও প্রতিষ্ঠানটি অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রূপপুর প্রকল্প থেকে অর্থ পাচারের অভিযোগে শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয়, যেখানে একই সক্ষমতার (২৪০০ মেগাওয়াট) বিদ্যুৎকেন্দ্র অন্য দেশে সর্বোচ্চ ৪ বিলিয়ন ডলারে নির্মাণ সম্ভব। এই ব্যয়ের অসামঞ্জস্য এখন জাতীয় অর্থনীতির ওপর বড় চাপ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
২০২৪ সালের ১৭ আগস্ট ‘গ্লোবাল ডিফেন্স কর্প’ নামের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে দাবি করা হয়, রূপপুর প্রকল্পের অতিরিক্ত ব্যয়ের মাধ্যমে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার মালয়েশিয়ার বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে পাচার করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এই প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করেন সজীব ওয়াজেদ জয় ও টিউলিপ সিদ্দিক।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১৭ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটি দেশের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা থাকলেও এর আড়ালে অর্থ লোপাটের অভিযোগ রয়েছে। রোসাটেমের মাধ্যমে সোভিয়েত আমলের প্রযুক্তি কেনার নামে অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
অন্যদিকে, রূপপুর কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনে বিতরণের দায়িত্বে থাকা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)-এর এক কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পের ব্যয়ের বিস্তারিত নথিপত্র সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। পিডিবির চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম জানান, বিদ্যুতের মূল্য এখনো নির্ধারণ করা হয়নি এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য চাওয়া হয়েছে।
এই বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (Transparency International Bangladesh)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রূপপুর প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ ইতোমধ্যে ব্যাপক আলোচিত। তিনি মনে করেন, প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি প্রায়শই দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে এবং এই প্রকল্পেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। তাই আরও গভীর অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে।
বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ঘোষণা করলেও, এই প্রকল্প নিয়ে তদন্তের গতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ ওঠার প্রায় ১৬ মাস পরও দুর্নীতি দমন কমিশন (Anti-Corruption Commission – ACC) চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে পারেনি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, কমিশনের কার্যক্রম আংশিক স্থবির থাকায় তদন্ত ধীরগতিতে চলছে।
দুদক সূত্র জানায়, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তা চেয়ে এমএলআর পাঠানো হলেও সেগুলোর প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে। প্রয়োজনীয় নথি না পাওয়ায় তদন্ত এগোচ্ছে না।
দুদকের মহাপরিচালক আক্তার হোসেন জানান, কমিশন না থাকায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না, ফলে কার্যক্রমে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। নতুন তদন্ত অনুমোদনও আপাতত সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে, সাম্প্রতিক এক উন্নয়নে রূপপুর কেন্দ্রের একটি ইউনিটে জ্বালানি লোড করা হয়েছে। এর ফলে চলতি বছরের আগস্টে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এই ইতিবাচক অগ্রগতির মাঝেও দুর্নীতির অভিযোগ প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
