যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এআরটি চুক্তি নিয়ে বিতর্ক, ইউনূস জানতেন কি না—প্রশ্নের মুখে শফিকুল আলম

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড বা এআরটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ (Bangladesh)। এর ফলে দেশীয় পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত পালটা শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে কমে ১৯ শতাংশ হয়েছে।

জানা গেছে, ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র নির্বাহী আদেশ নম্বর ১৪২৫৭-এর মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশের ওপর বিভিন্ন হারে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পালটা শুল্ক আরোপ করে। এরপরই সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও বাণিজ্য উপদেষ্টা মার্কিন কর্তৃপক্ষকে চিঠি পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন এবং আলোচনার মাধ্যমে ওই শুল্ক প্রত্যাহার বা কমানোর অনুরোধ জানান।

যুক্তরাষ্ট্র পালটা শুল্ক আরোপের পর প্রায় সব বাণিজ্য অংশীদার দেশের কাছে একটি অভিন্ন আরটি চুক্তির খসড়া পাঠায়। যেসব দেশ ওই চুক্তি নিয়ে আলোচনায় অংশ নেয়, তাদের ওপর আরোপিত শুল্কহার কমিয়ে ৩০ আগস্ট একটি সংশোধিত আরটি হার নির্ধারণ করে ওয়াশিংটন। বাংলাদেশের জন্য সেই হার নির্ধারিত হয় ২০ শতাংশ।

তবে এআরটি বাতিলের দাবিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। গত ২১ এপ্রিল বিকালে বরিশাল নগরীর রূপাতলি, চৌমাথা ও নথুল্লাবাদ এলাকায় পথসভা ও গণসংযোগ করে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট। পথসভায় বক্তারা বলেন, ৯ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য ক্ষতিকর।

বিগত সরকারের এই চুক্তি এখন কতটা প্রাসঙ্গিক—এমন প্রশ্ন ঘিরেই সাংবাদিক খালেদ মহিউদ্দিন (Khaled Mohiuddin)-এর ‘ঠিকানা’ টকশোতে মুখোমুখি হন সিনিয়র সাংবাদিক এবং সাবেক প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম (Shafiqul Alam)।

খালেদ মহিউদ্দিন শফিকুল আলমের কাছে জানতে চান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে এআরটি চুক্তি হয়েছিল এবং গত ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষর করা হয়েছিল, সেটি স্বাক্ষরের বিষয়টি ড. মুহাম্মদ ইউনূস (Dr. Muhammad Yunus) জানতেন কি না।

জবাবে শফিকুল আলম বলেন, “এটা তো এপ্রুভ হয়েছে; ক্যাবিনেটে তো এটা ডিসকাশন হয়েছে, তো অবশ্যই জানার তো কথা।”

এরপর খালেদ মহিউদ্দিন বলেন, শফিকুল আলমের লেখায় তারা পড়েছেন—কেবিনেটেও ইউনূস চাইতেন যাতে তিনি থাকেন। প্রেস সচিব হলেও প্রতিটি কেবিনেট মিটিংয়ে তিনি উপস্থিত থাকতেন। তাই তিনি জানতে চান, কেবিনেটেই কি চুক্তিটি অনুমোদিত হয়েছিল?

জবাবে শফিকুল আলম বলেন, এ ধরনের চুক্তি কেবিনেটে অনুমোদন করতেই হয়। কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সই করা হলে তার অনুমোদন নিতে হয়। এমনকি কোনো দেশের সঙ্গে ‘ডাবল ট্যাকসেশন চুক্তি’র মতো ছোটখাটো চুক্তির ক্ষেত্রেও কেবিনেটের অনুমোদন লাগে।

চুক্তিটি যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি, সেটি কেবিনেটে অনুমোদিত হয়েই সেখানে গেছে কি না—এমন প্রশ্নে শফিকুল আলম বলেন, “জি অবশ্যই। এটা তো লাগবেই; এটাই আমার জানা।”

খালেদ মহিউদ্দিন এরপর সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান (Khalilur Rahman)-এর বক্তব্যের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, চুক্তিটি যেহেতু নির্বাচনের খুব কাছাকাছি সময়ে হয়েছে, তাই বড় দুটি দল—বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছিল। চুক্তির বিষয়বস্তু, সই করা বা না করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে—এটি সত্য কি না জানতে চান তিনি।

জবাবে শফিকুল আলম বলেন, বিষয়টি যেহেতু খলিলুর রহমানের মন্ত্রণালয়ের এবং তিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন, পাশাপাশি তিনি অন্যতম প্রধান আলোচকও ছিলেন, তাই তিনি যেহেতু বলেছেন—তাহলে তা সত্য।

খালেদ জানতে চান, কেবিনেটে কি আলোচনা হয়েছিল যে বড় দুই দলকে এ বিষয়ে যুক্ত করা হবে?

শফিকুল আলম বলেন, বিষয়টি তিনি জানেন না। তবে তারা একটি ট্রানজিশনের মধ্যে ছিলেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, প্রফেসর ইউনূস জাতিসংঘ সফরে গিয়েছিলেন এবং তাঁর দ্বিতীয় জাতিসংঘ সফরে নেতৃত্বস্থানীয় তিনটি দলের ছয়জন প্রতিনিধিকে সঙ্গে নিয়েছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটে যারা আলোচনা করেছেন, তারা ক্ষমতার সম্ভাব্য প্রধান দাবিদারদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন—কারণ শেষ পর্যন্ত চুক্তিটি ratify করবে ক্ষমতায় আসা রাজনৈতিক পক্ষগুলোই।

খালেদ আবার জানতে চান, তাহলে এনসিপি, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে চুক্তির বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা হয়েছিল কি না।

শফিকুল আলম বলেন, “আমি জানি না; এটা আমার বিষয় না। কেবিনেটে ওই পার্টিগুলোর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল এটা আমি জানি না।”

খালেদ বলেন, কেবিনেটে যদি আলোচনা না হয়ে থাকে, তাহলে খলিলুর রহমান নিশ্চয়ই বিষয়টি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।

জবাবে শফিকুল আলম বলেন, কেবিনেটে সাধারণত সেই বিষয়গুলোই আলোচিত হয়, যেগুলোর জন্য সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন। নতুন আইন, নতুন গাইডলাইন বা নতুন চুক্তির ক্ষেত্রে কেবিনেটে আলোচনা হয়। তবে কোনো মন্ত্রী যদি মনে করেন, তিনি কোনো বিষয়ে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কথা বলবেন, তাহলে তিনি নিজের মতো করে তা বলতে পারেন।

খালেদ মহিউদ্দিন বলেন, বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কথা বলা হলে নিশ্চয়ই সেটি হয় ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অবগত করে, নয়তো তাঁর অনুমতি নিয়ে, অথবা ইউনূস নিজেই বলেছেন—এমন হওয়াই উচিত।

এর উত্তরে শফিকুল আলম বলেন, এ বিষয়ে খলিলুর রহমানের সঙ্গেই কথা বলা উচিত।

এরপর খালেদ জানতে চান, সাধারণত কাঠামোটা কী। জবাবে শফিকুল আলম বলেন, কোনো মন্ত্রণালয়ের খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যদি কেবিনেটে আলোচনার প্রয়োজন না-ও হয়, তবু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী চাইলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বলতে পারেন—তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ করছেন। সরকারপ্রধানকে brief দেওয়া একটি প্রতিষ্ঠিত নীতি।

খালেদ মহিউদ্দিন আবার বলেন, বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেছেন—এক বছর ধরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল এবং নির্বাচনের আগেই দেশের প্রধান দুই দলের প্রধানকে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। এটি কি খলিলুর রহমান ড. ইউনূসকে না জানিয়ে করেছিলেন বলে শফিকুল আলম মনে করেন?

জবাবে শফিকুল আলম বলেন, এটি তিনি জানেন না। তবে বিষয়টি যেহেতু কেবিনেটে আলোচনা হয়েছে এবং যারা নেগোশিয়েশনে ছিলেন, তারা এ বিষয়ে বলতে পারেন।

খালেদ এরপর বলেন, নির্বাচনের আগে দেশের প্রধান দুই দলের প্রধানকে জানানো হয়েছিল এবং তারা সম্মতি দিয়েছিলেন—এমন বক্তব্যের বিপরীতে জামায়াতের আমিরকে তিনি বলতে শুনেছেন, তাদের সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। তাহলে খলিলুর রহমান বা জামায়াতের আমির—দুজনের একজন মিথ্যা বলছেন কি না, সে বিষয়ে শফিকুল আলমের ধারণা কী?

জবাবে শফিকুল আলম বলেন, এ বিষয়ে তাঁর মন্তব্য করার কিছু নেই। কারণ পুরো বক্তব্য যাচাই করতে হলে খলিলুর রহমানের সঙ্গে কথা বলতে হবে। এ ট্রেড ডিলের আলোচনায় যারা যুক্ত ছিলেন, তাদেরও প্ল্যাটফর্মে এনে জিজ্ঞেস করা যেতে পারে।