৪০ হাজার কোটি টাকার চুক্তি: বিমানের বহরে আসছে ১৪ নতুন বোয়িং, বদলাবে আকাশপথের হিসাব

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে নতুন উড়োজাহাজ কেনার পথে বড় পদক্ষেপ নিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স (Biman Bangladesh Airlines)। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং (Boeing)-এর সঙ্গে ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে রাষ্ট্রীয় এই সংস্থাটি।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত হয় এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান। বিমানের পক্ষে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও কাইজার সোহেল আহমেদ এবং বোয়িংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট পল রিঘি নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের হয়ে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

এই চুক্তির আওতায় কেনা উড়োজাহাজগুলোর বাজার মূল্য প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার সমান। উপস্থিত অতিথিদের বক্তব্যে যেমন ছিল আশাবাদ, তেমনি ছিল কৌশলগত বার্তাও।

অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয়—বরং যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার একটি সেতুবন্ধন। তার ভাষায়, এই উদ্যোগ বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে আরও দৃশ্যমান করে তুলবে।

চুক্তি স্বাক্ষরের সময় বোয়িংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট পল রিঘি একে “যুগান্তকারী মুহূর্ত” হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বিশ্বের সেই অল্প কয়েকটি এয়ারলাইন্সের কাতারে উঠে আসবে, যারা একসঙ্গে ৭৮৭ ড্রিমলাইনার সিরিজের—৭৮৭-৮, ৭৮৭-৯ এবং ৭৮৭-১০—সবগুলো মডেল পরিচালনা করবে।

নতুন যুক্ত হওয়া উড়োজাহাজগুলোর মধ্যে রয়েছে ৮টি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, ২টি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং ৪টি বোয়িং ৭৩৭-৮ ম্যাক্স জেট। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৭৮৭-১০ উড়োজাহাজগুলো মধ্যপ্রাচ্যের মতো উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন রুটে ব্যবহৃত হবে, আর ৭৮৭-৯ পরিচালিত হবে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দীর্ঘ রুটে। অন্যদিকে ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজগুলো চলবে আঞ্চলিক ও স্বল্প দূরত্বের গন্তব্যে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন প্রজন্মের এই উড়োজাহাজগুলো বর্তমান বহরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি জ্বালানি সাশ্রয়ী। উন্নত কেবিন সুবিধা, আরামদায়ক আসন ও মসৃণ ভ্রমণ অভিজ্ঞতা যাত্রীসেবাকে নতুন মাত্রা দেবে। একই সঙ্গে এই বিনিয়োগ বিমানের ফ্লিট আধুনিকীকরণ, নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক বিমান চলাচল বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এই বড় সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ তিন বছরের প্রতিযোগিতা। ইউরোপীয় নির্মাতা এয়ারবাস (Airbus)-এর সঙ্গে সমানতালে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত চুক্তি পায় বোয়িং। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১০টি এয়ারবাস কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina) সরকারের পতনের পর এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষার কৌশলগত বিবেচনায় অন্তর্বর্তী সরকার বোয়িংয়ের দিকেই ঝুঁকে পড়ে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই উড়োজাহাজগুলোর মূল্য ১০ থেকে ২০ বছর মেয়াদি কিস্তিতে পরিশোধ করা হবে। বছরে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা পরিশোধের সম্ভাবনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, এই চুক্তির বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

বর্তমানে বিমানের বহরে রয়েছে ১৯টি উড়োজাহাজ। গত বছর লিজের মেয়াদ শেষে দুটি উড়োজাহাজ ফেরত দেওয়ায় বহর আরও ছোট হয়ে যায়। এখন বহরে আছে চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর, চারটি বোয়িং ৭৮৭-৮, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯, চারটি বোয়িং ৭৩৭ এবং পাঁচটি ড্যাশ-৮-৪০০।

বিমান বর্তমানে ২২টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। পাশাপাশি মালদ্বীপের মালে, ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা, শ্রীলঙ্কার কলম্বো এবং অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে নতুন রুট চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে, যেগুলোকে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে নতুন উড়োজাহাজ আসতে সময় লাগবে। বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোশরা ইসলাম জানিয়েছেন, প্রথম ডেলিভারি পেতে ২০৩১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ফলে স্বল্পমেয়াদে উড়োজাহাজ সংকট কাটার সম্ভাবনা কম।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিনের সিদ্ধান্তহীনতা কাটিয়ে অবশেষে বড় বিনিয়োগের পথে হাঁটলেও বাস্তব সুফল পেতে সময় লাগবে। তবে এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে আকাশপথে বাংলাদেশের অবস্থান যে বদলাতে শুরু করবে, তা নিয়ে খুব একটা সন্দেহ নেই।