ইরান যুদ্ধের প্রকৃত ব্যয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। যুদ্ধ শুরুর তিন মাস পর প্রথমবারের মতো ক্যাপিটল হিল (Capitol Hill)-এ উপস্থিত হয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে মুখোমুখি হতে হয়েছে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের কঠোর প্রশ্নের।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা (Al Jazeera)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটির শুনানিতে পেন্টাগন (Pentagon) জানায়, ইরান যুদ্ধে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৫ বিলিয়ন ডলার। এই বিপুল অর্থের বড় অংশ ব্যয় হয়েছে গোলাবারুদ এবং সামরিক সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণে।
তবে এই হিসাবকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন ডেমোক্র্যাট নেতারা ও অর্থনীতিবিদরা। তাদের দাবি, যুদ্ধের প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব অনেক গভীর এবং বিস্তৃত। তাদের মতে, সামগ্রিক ব্যয় ৬৩০ বিলিয়ন থেকে ১ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে—যা পেন্টাগনের হিসাবের তুলনায় বহুগুণ বেশি।
শুনানির সময় সমালোচনার মুখে স্পষ্টতই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তিনি বিরোধীদের এই মূল্যায়নকে ‘বেপরোয়া ও পরাজয়বাদী’ আখ্যা দেন। একইসঙ্গে তিনি সরকারের অবস্থানকে সঠিক বলে দাবি করেন।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) প্রশাসন আগামী অর্থবছরের জন্য ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল প্রতিরক্ষা বাজেট চেয়েছে—যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ সামরিক বরাদ্দ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পেন্টাগনের ভারপ্রাপ্ত নিয়ন্ত্রক জে হার্স্ট জানিয়েছেন, ২৫ বিলিয়ন ডলারের হিসাবটি কেবল সরাসরি যুদ্ধ পরিচালনার ব্যয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। এতে অপারেশনাল খরচ ও গোলাবারুদ অন্তর্ভুক্ত থাকলেও যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক প্রভাব বা পরোক্ষ ব্যয় এতে ধরা হয়নি।
অন্যদিকে, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ লিন্ডা বিলমেস মনে করেন, যুদ্ধের প্রকৃত ব্যয় অনেক বেশি এবং তা ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তার হিসাবে, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার করে ব্যয় হচ্ছে এই যুদ্ধে।
প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে প্রতি গ্যালন ৪.২৩ ডলারে পৌঁছেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, যা সরাসরি রাজনৈতিক প্রভাব ফেলছে।
রয়টার্স/আইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২২ শতাংশ আমেরিকান জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলায় ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপকে সমর্থন করছেন। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক চাপ রাজনৈতিক জনপ্রিয়তায়ও ধস নামাচ্ছে।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে ইরানের হামলায় যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা মেরামত করতেও বিপুল অর্থ ব্যয় হতে পারে। বিশেষ করে বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিটের সদর দপ্তর পুনর্গঠনে অন্তত ২০০ মিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে বলে জানিয়েছে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস (The New York Times)।
সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধ শুধু সামরিক নয়—অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


