হিটলারের মৃত্যু ঘিরে ধোঁয়াশা ও বিতর্ক: আত্মহত্যা থেকে লাশ গায়েবের রহস্য আজও অমীমাংসিত

১৯৪৫ সালের ১ মে বিবিসি রেডিওতে সংবাদ পাঠক স্টুয়ার্ট হিবার্ড যখন ঘোষণা দেন—“হিটলার মারা গেছেন”—তখন থেকেই বিশ্ব ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলেও, সেই মৃত্যু ঘিরে রহস্যের শেষ হয়নি আজও।

লন্ডনের সেই রাতেই জার্মান রেডিও প্রথম ঘোষণা দেয়, আডলফ হিটলার (Adolf Hitler) যুদ্ধরত অবস্থায় মারা গেছেন। তবে পরে জানা যায়, তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। এরপর থেকেই শুরু হয় তার শেষ সময় ও মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা, বিতর্ক ও রহস্যের গল্প।

ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে যখন সোভিয়েত বাহিনী বার্লিনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন হিটলার তার ঘনিষ্ঠ সহচরদের নিয়ে একটি ভূগর্ভস্থ বাংকারে আশ্রয় নেন। সেই বাংকারে ছিলেন তার সেক্রেটারি ট্রাউডল ইয়ুঙ্গে, যিনি পরে তার স্মৃতিচারণায় হিটলারের শেষ সময়ের অনেক অজানা তথ্য তুলে ধরেন।

ইয়ুঙ্গের ভাষ্য অনুযায়ী, হিটলার অনেক আগেই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং তার ঘনিষ্ঠদের বিষয়টি জানানো ছিল। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, বার্লিনে পরাজয় নিশ্চিত হলে তিনি পালাবেন না, বরং সেখানেই নিজের জীবন শেষ করবেন।

১৯৪৫ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ২৭ এপ্রিলের মধ্যে বার্লিন প্রায় সম্পূর্ণভাবে সোভিয়েত বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এরপর হিটলার বুঝতে পারেন, পরাজয় অনিবার্য। ঠিক তখনই তিনি দীর্ঘদিনের সঙ্গী ইভা ব্রাউনকে বিয়ে করেন এবং নিজের শেষ উইল ঘোষণা করেন।

বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য অনুযায়ী, ৩০ এপ্রিল হিটলার ও ইভা ব্রাউন আত্মহত্যা করেন। ধারণা করা হয়, হিটলার সায়ানাইড গ্রহণের পাশাপাশি নিজেকে গুলি করেন, আর ইভা ব্রাউন সায়ানাইড গ্রহণ করেন। তবে এ ঘটনার বিস্তারিত তথ্য নিয়ে আজও ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দেহরক্ষী রখুস মিশ পরে বিবিসিকে জানান, গুলির শব্দ শোনার পর তারা হিটলারের ঘরে প্রবেশের অনুমতি পান এবং সেখানে তার নিথর দেহ দেখতে পান। পরে লাশ বাইরে নেওয়া ও পোড়ানোর ঘটনা ঘটে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তবে সবচেয়ে বড় রহস্য তৈরি হয় হিটলারের মরদেহ নিয়ে। যুদ্ধ শেষে রাশিয়ান বাহিনী বাংকার দখল করলেও হিটলারের লাশ কোথায় গেছে, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। পরে বিভিন্ন সময়ে দাবি করা হয়, তার দেহাবশেষ মস্কোতে সংরক্ষিত ছিল বা পরবর্তীতে ধ্বংস করা হয়েছে—কিন্তু এসব দাবির সত্যতা নিশ্চিত নয়।

১৯৯৩ সালে রাশিয়া দাবি করে, হিটলারের দেহাবশেষ তাদের কাছে রয়েছে। পরে ২০০০ সালে মস্কোতে এক প্রদর্শনীতে তার মাথার খুলির অংশ দেখানোর কথাও বলা হয়। তবে জার্মান ইতিহাসবিদ ও গবেষক ওয়ার্নার মেইসার এসব দাবিকে ‘ভুয়া’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হিটলারের মৃত্যু আত্মহত্যা হিসেবে ঐতিহাসিকভাবে গ্রহণযোগ্য হলেও তার দেহাবশেষ নিয়ে রহস্য আজও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। রুশ বাহিনীর তথ্য গোপন রাখা এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা নথিতে পরস্পরবিরোধী তথ্য এই বিতর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিবিসি বাংলা-সহ বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, হিটলারের বাংকার ও তার শেষ মুহূর্ত নিয়ে বহু গবেষণা, সাক্ষাৎকার ও প্রামাণ্যচিত্র তৈরি হলেও, তার লাশের প্রকৃত অবস্থান ও পরিণতি নিয়ে আজও ইতিহাসবিদদের মধ্যে কোনো চূড়ান্ত ঐকমত্য নেই।