হার স্বীকার নয়, পদত্যাগেও অস্বীকৃতি—মমতা ইস্যুতে কী বলছে ভারতের সংবিধান?

পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জী (Mamata Banerjee)-র নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী পরাজয়ের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে এক নতুন বিতর্ক। মুখ্যমন্ত্রী নিজেই ঘোষণা করেছেন—তিনি নির্বাচন হারেননি, তাই পদত্যাগও করবেন না। কিন্তু এমন অবস্থায় ভারতের সংবিধান কী বলে, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

নিয়ম অনুযায়ী, বুধবার ৬ মে শেষ হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের বিদায়ী মন্ত্রিসভার মেয়াদ। এই সময়সীমা পার হলে আইনগতভাবে মুখ্যমন্ত্রী এবং তার মন্ত্রিসভা আর কার্যকর থাকার কথা নয়। তবুও এখনো পদত্যাগ করেননি মমতা ব্যানার্জী; বরং তিনি দাবি করেছেন, নির্বাচনে পরাজয়ের প্রশ্নই ওঠে না।

তার ভাষায়, “আমি কেন পদত্যাগ করব? আমরা হারিনি, তাই পদত্যাগ করবও না। পরাজয়ের প্রমাণ থাকলে আমরা পদত্যাগ করতাম। কেউ আমাকে বাধ্য করলেও আমি পদত্যাগ করব না।”

তিনি এ প্রসঙ্গে বিজেপি (BJP)-র বিরুদ্ধে অসৎ উপায়ে নির্বাচনে জয়ের অভিযোগও তুলেছেন।

সংবিধান কী বলছে?

ভারতের সংবিধানের ১৬৪ অনুচ্ছেদে রাজ্যের মন্ত্রিপরিষদ গঠন এবং রাজ্যপালের ক্ষমতা সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। প্রতিটি নির্বাচনের পর রাজ্যপাল বিধানসভায় দলগুলোর আসনসংখ্যা মূল্যায়ন করে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকে সরকার গঠনের আহ্বান জানান। এরপর মুখ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ সম্পন্ন হয়।

আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি বিধানসভার সদস্য না হন, তবে তাকে ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচনে জিতে সদস্য হতে হবে—এই নিয়ম মুখ্যমন্ত্রীসহ সকল মন্ত্রীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

এই প্রসঙ্গে ২০১১ সালের উদাহরণ উল্লেখযোগ্য, যখন মমতা ব্যানার্জী প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী হন বিধায়ক না হয়েও। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচনে জিতে তিনি বিধানসভার সদস্য হন। একইভাবে ২০২১ সালে নন্দীগ্রাম (Nandigram)-এ পরাজয়ের পরও তিনি মুখ্যমন্ত্রী হন এবং পরবর্তীতে উপনির্বাচনে জিতে পুনরায় সদস্যপদ অর্জন করেন।

তবে যদি কেউ নির্ধারিত ছয় মাসের মধ্যে বিধায়ক হতে ব্যর্থ হন, তাহলে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পদ হারান।

‘রাজ্যপালের ইচ্ছা’—এর অর্থ কী?

সংবিধানের ১৬৪(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী “রাজ্যপালের ইচ্ছা সাপেক্ষে” পদে থাকেন। কিন্তু এই ‘ইচ্ছা’ আসলে কী বোঝায়?

দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (Jawaharlal Nehru University)-এর গবেষক ড. সুধীর কে. সুতারের ব্যাখ্যায়, এই ইচ্ছা মূলত নির্ভর করে বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধিদের আস্থার ওপর। অর্থাৎ, যে নেতা সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন পান, তাকেই সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়।

তার মতে, যদি কোনো মুখ্যমন্ত্রী পদত্যাগ না করেন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারান, তাহলে রাজ্যপাল তার ক্ষমতা প্রয়োগ করে সেই সরকারকে বরখাস্ত করতে পারেন।

মেয়াদ শেষ, তবুও পদে থাকা?

সংবিধানের ১৭২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো রাজ্যের বিধানসভার মেয়াদ পাঁচ বছর। এই সময়সীমা শেষ হলে বিধানসভা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়। সে ক্ষেত্রে নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।

দিল্লির বিধি সেন্টার ফর লিগ্যাল পলিসির বিশেষজ্ঞ স্বপ্নিল ত্রিপাঠির মতে, বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ করা একটি প্রতিষ্ঠিত প্রথা হলেও এটি না মানলে আইনগত পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন ঘটে না। রাজ্যপাল তখন তার ‘ইচ্ছা’ প্রত্যাহার করে নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতাকে সরকার গঠনের আহ্বান জানাতে পারেন।

অন্যদিকে, সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ পিডিটি আচারিয়ার মতে, কোনো সরকার পাঁচ বছরের বেশি টিকতে পারে না। তাই মমতা ব্যানার্জী পদত্যাগ না করলেও, নতুন মুখ্যমন্ত্রী শপথ নেওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি কেবল অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্বে থাকতে পারেন।

রাজনৈতিক অভিযোগ ও পাল্টা প্রতিক্রিয়া

নির্বাচনী পরাজয়ের জন্য নির্বাচন কমিশন (Election Commission)-কে দায়ী করেছেন মমতা ব্যানার্জী। তার অভিযোগ, “১০০-র বেশি আসন লুট করা হয়েছে… আমরা হারিনি, ভোট লুট হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, দলের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করা হবে এবং প্রয়োজনে রাজপথেও নামবেন।

অন্যদিকে বিজেপির পক্ষ থেকে তার এই বক্তব্যকে ‘অসাংবিধানিক’ ও ‘হাস্যকর’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। দলের মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার মন্তব্য করেছেন, এমন বক্তব্য সংবিধানে বিশ্বাসী কেউ দিতে পারেন না।

অতীতের নজির

ভারতের ইতিহাসে নির্বাচনী পরাজয়ের পর মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগে অস্বীকৃতি প্রায় নজিরবিহীন। তবে বিভিন্ন কেলেঙ্কারির ঘটনায় পদ ছাড়তে অনীহা দেখানোর উদাহরণ রয়েছে।

২০২৪ সালে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল (Arvind Kejriwal) জেলে যাওয়ার পরও পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানান। আবার ২০১৪ সালে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী জে. জয়ললিতা দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও পদ ছাড়তে চাননি, যদিও পরে আইন অনুযায়ী তাকে অপসারণ করা হয়।

এছাড়া ১৯৯৬ সালে বিহারের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ যাদব (Lalu Prasad Yadav) কেলেঙ্কারির অভিযোগে প্রথমে পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানালেও পরে পদ ছাড়েন এবং তার স্ত্রীকে মুখ্যমন্ত্রী করেন।

সব মিলিয়ে, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল রাজনৈতিক বিতর্ক নয়—এটি ভারতের সাংবিধানিক কাঠামো ও প্রথার বাস্তব প্রয়োগ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলছে।