ছেলের হাতে ক্লাস, হাজিরা খাতায় মায়ের স্বাক্ষর— চাঁদপুরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাঞ্চল্যকর অনিয়মের অভিযোগ

চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার ১৫২নং দক্ষিণ বদরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষক হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করছেন শিক্ষিকা, অথচ শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করছেন তার সদ্য আলিমে ভর্তি হওয়া ছেলে মিরাজুন্নবী সিয়াম। ঘটনাটি সামনে আসার পর স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

সম্প্রতি বিদ্যালয়টিতে গিয়ে দেখা যায়, পঞ্চম শ্রেণির ইংরেজি ক্লাস নিচ্ছেন মিরাজুন্নবী সিয়াম। অথচ শিক্ষক হাজিরা খাতায় নিয়মিত স্বাক্ষর রয়েছে তার মা শিক্ষিকা ফাতেমা বেগমের। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান করতে পারছেন না তিনি। তবে সরকারি বিধি অনুযায়ী তিনি আনুষ্ঠানিক ছুটি নিয়েছিলেন কি না— সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি।

শিক্ষিকা ফাতেমা বেগম নিজেও স্বীকার করেছেন, অসুস্থতার কারণে তার ছেলে ক্লাস নিচ্ছে। শুধু এবার নয়, গত বছরও প্রায় দেড় থেকে দুই মাস একইভাবে ছেলে দিয়ে পাঠদান করানোর কথা জানিয়েছেন মিরাজুন্নবী সিয়াম।

বিদ্যালয়ের কয়েকজন সহকর্মী জানিয়েছেন, ফাতেমা বেগম অনেক সময় স্কুলে এসে শুধুমাত্র হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে চলে যেতেন। এরপর তার ছেলে শ্রেণিকক্ষে গিয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করাতেন। বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই চললেও প্রশাসনিকভাবে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থেকেই এই অনিয়ম করে আসছিলেন ওই শিক্ষিকা। কেউ কেউ বলছেন, এক প্রভাবশালী আইনজীবী আত্মীয়ের কারণে বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক অভিভাবক বলেন, “একজন প্রশিক্ষিত শিক্ষকের জায়গায় সদ্য দাখিল পাশ করা ছেলে যদি ক্লাস নেয়, তাহলে শিশুদের শিক্ষার মান কীভাবে নিশ্চিত হবে?”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষিকা ফাতেমা বেগম বলেন, “আমার অসুস্থতার কারণে ছেলে ক্লাস নিচ্ছে।” তবে এটি নিয়মবহির্ভূত কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্টভাবে কিছু বলতে পারেননি। পরে একপর্যায়ে স্বীকার করেন, “আমার ভুল হয়ে গেছে।”

পঞ্চম শ্রেণির ক্লাস শেষে বের হওয়ার সময় মিরাজুন্নবী সিয়াম বলেন, “মায়ের অসুস্থতার জন্য আমি ক্লাস নিচ্ছি। গত বছরও প্রায় দেড়-দুই মাস ক্লাস করিয়েছি। এখন আবার অসুস্থ, তাই ক্লাস নিচ্ছি।”

ঘটনাটি নিয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফারহানা আক্তারকে প্রশ্ন করা হলে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারবো না।”

এদিকে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শিরিন সুলতানা জানিয়েছেন, শিক্ষিকার পরিবর্তে ছেলে ক্লাস নেওয়ার বিষয়টি তারা জেনেছেন এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চাঁদপুর (Chandpur) জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মুহাম্মদ মোছাদ্দেক হোসেন বলেন, “ঘটনার তদন্ত করা হবে। সত্যতা পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (Directorate of Primary Education)-এর বিভাগীয় উপ-পরিচালক মো. নূরুল ইসলাম জানিয়েছেন, জেলা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এমন অনিয়ম শুধু শিক্ষাব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি করছে।