যুক্তরাষ্ট্রে খ্রিস্টান জায়নবাদের প্রভাব কি কমছে? তরুণদের বদলে যাওয়া দৃষ্টিভঙ্গিতে নতুন বিতর্ক

কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কূটনৈতিক অবস্থানে গভীর প্রভাব বিস্তার করে এসেছে তথাকথিত ‘খ্রিস্টান জায়নবাদ’। বিশেষ করে রক্ষণশীল ও ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টানদের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইল (Israel)-এর প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন দিয়ে এসেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই অবস্থানে পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে। বিভিন্ন জরিপ ও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইসরাইলকে ঘিরে আগের মতো একতরফা সমর্থন আর নেই।

ঐতিহাসিকভাবে খ্রিস্টান জায়নবাদীরা বিশ্বাস করেন, যিশু খ্রিস্টের পুনরাগমনের পূর্বশর্ত হিসেবে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের পুনর্বাসন এবং একটি শক্তিশালী ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ধর্মীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিশ্বাসকে ঘিরেই যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘বাইবেল বেল্ট’ অঞ্চলে বিশাল সমর্থকগোষ্ঠী গড়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে তারা রিপাবলিকান পার্টি (Republican Party)-এর অন্যতম শক্তিশালী ভোটব্যাংক হিসেবেও বিবেচিত হয়ে আসছে।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে গাজা (Gaza)-তে ইসরাইলের সামরিক অভিযান, মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা এবং মানবাধিকার ইস্যু তরুণদের ভাবনায় বড় প্রভাব ফেলেছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, তরুণ ইভানজেলিক্যালদের মধ্যে ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণিভিত্তিক মতাদর্শে বিশ্বাস আগের তুলনায় কমে এসেছে। এক দশক আগে যেখানে অধিকাংশ ইভানজেলিক্যাল এই তত্ত্বে আস্থাশীল ছিলেন, এখন অনূর্ধ্ব-৩০ বয়সীদের মধ্যে সেই হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একইসঙ্গে তরুণদের বড় একটি অংশ সরাসরি ইসরাইলের প্রতি সমর্থন জানাতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান তরুণ প্রজন্ম ইসরাইলকে আর কেবল ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করছে না। বরং তারা ফিলিস্তিনিদের প্রতি আচরণ, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টার (Pew Research Center)-সহ বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, তরুণ রিপাবলিকানদের একটি বড় অংশ মনে করছে মার্কিন রাজনীতিতে ইসরাইলের প্রভাব অতিরিক্ত মাত্রায় বেড়ে গেছে।

যদিও সাধারণ মানুষের মধ্যে সমর্থনে ভাটা পড়ার আভাস মিলছে, তবুও ওয়াশিংটনে খ্রিস্টান জায়নবাদী গোষ্ঠীগুলোর রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রভাব এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী। ইসরাইলপন্থী বিভিন্ন সংগঠন প্রতি বছর বিপুল অর্থ ব্যয় করছে মার্কিন সহায়তা নিশ্চিত করতে এবং মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে।

আল জাজিরা (Al Jazeera)-র এক অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, ইসরাইলপন্থী মার্কিন খ্রিস্টান সংগঠনগুলোর সম্মিলিত বার্ষিক আয় কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। গবেষকদের মতে, এসব সংগঠনের মূল শক্তি শুধু লবিং কার্যক্রম নয়, বরং তৃণমূল পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক সমর্থককে সংগঠিত করার সক্ষমতা।

তবে তরুণদের এই পরিবর্তিত মনোভাব ভবিষ্যতে মার্কিন রাজনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সম্পর্কের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, নতুন প্রজন্ম এখন ইসরাইলকে বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণীর অংশ হিসেবে নয়, বরং মানবাধিকার, নৈতিকতা এবং বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের আলোকে মূল্যায়ন করছে। ফলে ‘খ্রিস্টান জায়নবাদ’-এর ভবিষ্যৎ ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন করে বিতর্ক ও আলোচনা শুরু হয়েছে।