কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার পরও নানা কৌশলে আবারও সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে আওয়ামী লীগ (Awami League)। দলটির মূল সংগঠন থেকে শুরু করে সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে নতুন করে কমিটি গঠনের তৎপরতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। একইসঙ্গে জনমনে প্রভাব ফেলতে পারে—এমন কিছু ইস্যু সামনে এনে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে দলটি। বিশেষ করে হামের টিকা সংক্রান্ত জটিলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির বিষয়কে সামনে এনে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের বিচারের দাবিতে মাঠ গরমের চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস (Dr. Muhammad Yunus) এবং তার নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারকে রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই এখন বেশি সক্রিয় হচ্ছে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ মহল। ইতোমধ্যে আইনি পদক্ষেপ, রিট আবেদন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা এবং পেশাজীবীদের ব্যবহার করে একটি সমন্বিত প্রচেষ্টার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তাদের ধারণা, এসব ইস্যুভিত্তিক কর্মসূচি ধীরে ধীরে বর্তমান বিএনপি (BNP) সরকারবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ নিতে পারে।
তবে সরকারের অবস্থান এখনো কঠোর। আওয়ামী লীগের কোনো ধরনের সাংগঠনিক কার্যক্রম বা বিশৃঙ্খলা নস্যাৎ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নজরদারি ও গ্রে’\ফতার অভিযান অব্যাহত রেখেছে। দলটির নেতাকর্মীদের ঝটিকা মিছিল, চোরাগোপ্তা কর্মসূচি কিংবা সাংগঠনিক পুনর্গঠনের চেষ্টা ঠেকাতে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে জানা গেছে।
আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রবল চাপে থাকা দলটি নির্বাচিত সরকারের অধীনে কিছুটা রাজনৈতিক স্পেস পাওয়ার আশা করেছিল। বিশেষ করে বিএনপি ক্ষমতায় এলে রাজনীতিতে ন্যূনতম সুযোগ তৈরি হবে বলে দলের একটি অংশ মনে করেছিল। নির্বাচনের আগে ও পরে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ কিছু ব্যক্তি প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে বিএনপির প্রতি সমর্থনও জানিয়েছিলেন। তবে বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। বরং নির্বাচনের পর বিভিন্ন স্থানে দলীয় কার্যালয় খুলতে গিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়েছে তাদের।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগকে আরও হতাশ করেছে তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধে জারি করা অধ্যাদেশটি বহাল থাকা। দলটির ধারণা ছিল, নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে ওই অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করবে না। কিন্তু সরকার সেটিকে বৈধতা দেওয়ায় দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তবুও দলটির ভেতরে কিছুটা চাঙ্গা ভাব ফিরেছে বলে জানা গেছে। নির্বাচনের পর আত্মগোপনে থাকা মধ্যম সারির কয়েকজন নেতা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেন। কয়েকজন নেতার জামিনও হয়। তবে পরে নতুন মামলায় গ্রে’\ফতার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের কারণে তারা আবারও চাপে পড়ে যান।
দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরাসরি বর্তমান সরকারকে আক্রমণ না করে সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরির কৌশল নিয়েছে। হামের টিকার অব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং প্রশাসনিক নানা সিদ্ধান্তকে সামনে এনে ড. ইউনূস (Dr. Muhammad Yunus)-এর বিচার দাবি তোলা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় দলটি তাদের সমর্থিত আইনজীবী, সাংবাদিক ও পেশাজীবীদের সামনে রাখছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি ড. ইউনূস ও সাবেক উপদেষ্টাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়েরের ঘটনাকে এই বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। এর আগে বিতর্কিত সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবীদের স্লোগান দেওয়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে।
ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে বর্তমানে প্রকাশ্যে কথা বলার মতো শক্ত অবস্থান না থাকায় আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ মহল সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের ভাষ্য, আজ তারা অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলছে, সুযোগ পেলে আগামীতে বর্তমান সরকারকেও টার্গেট করবে।
এদিকে গত ২৭ এপ্রিল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার এবং সরকারের কাছে চিঠি পাঠান কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি (Cox’s Bazar District Bar Association)-এর ১৭৩ জন সদস্য। তারা দ্রুত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টকশো ও পডকাস্টে অংশ নিয়ে দেশ-বিদেশের অনেকেই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার পক্ষে মত দিচ্ছেন।
গত বছরের ১২ মে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার আগে-পরে দলটির নেতাকর্মীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল ও চোরাগোপ্তা হামলার মতো কর্মসূচি পালন করে আসছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় মিছিল করতে গিয়ে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রে’\ফতার হয়েছেন, আবার কোথাও কোথাও জনরোষ কিংবা বিএনপি-জামায়াত এবং জুলাইযোদ্ধাদের ধাওয়ার মুখেও পড়েছেন।
সম্প্রতি চট্টগ্রামে সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের জানাজাকে ঘিরে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ব্যাপক শোডাউনও আলোচনায় আসে। সেখানে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দেখা যায় তাদের। এছাড়া লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর শপথ নেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
দলীয় সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন অ্যাপস ব্যবহার করে সাংগঠনিক যোগাযোগ জোরদার করছে। বিদেশে অবস্থানরত কেন্দ্রীয় নেতারা জেলা-উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন এবং সাংগঠনিক নির্দেশনাও দিচ্ছেন।
একাধিক সূত্রের দাবি, দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina) নিজেও নিয়মিতভাবে এসব অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হচ্ছেন। তিনি নেতাকর্মীদের নতুন করে কমিটি গঠন এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করার নির্দেশ দিচ্ছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। বিভিন্ন অডিও ক্লিপে তাকে নেতাকর্মীদের উদ্দেশে সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানাতে শোনা গেছে। যদিও এসব অডিওর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে আওয়ামী লীগের ভেতরেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। দলটির অনেক নেতাকর্মী মনে করেন, নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখতেই এমন বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। তবে তার ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘প্রত্যাবর্তন ২.০ লোডিং’ লেখা পোস্টার ছড়িয়ে পড়ে এবং দলীয় সমর্থকদের মধ্যে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. সাহাবুল হক (Dr. Sahabul Haque) মনে করেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা একটি দল প্রশাসন, পেশাজীবী সংগঠন ও স্থানীয় নেটওয়ার্কে কিছু প্রভাব ধরে রাখে। তার মতে, বর্তমান বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের প্রকাশ্যভাবে শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন কঠিন হলেও সরকার ও বিরোধী শক্তিগুলোর অনৈক্য ভবিষ্যতে দলটিকে ধীরে ধীরে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর ড. মাহবুব উল্লাহ (Dr. Mahbub Ullah) বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি দলের প্রকাশ্যে মিছিল করা উদ্বেগজনক। তার মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আরও কঠোর হলে এসব কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। একইসঙ্গে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তিগুলোর উচিত আওয়ামী লীগের অতীত দুঃশাসন, গু’\ম-খু’\ন, অর্থপাচার ও জুলুম-নির্যাতনের বিষয়গুলো জনগণের সামনে তুলে ধরা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা আত্মগোপনে চলে যান। দলের সভাপতি শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তারপর থেকেই দলটির কার্যক্রম কার্যত সীমিত হয়ে পড়ে, যদিও সাংগঠনিক পুনরুজ্জীবনের নানা প্রচেষ্টা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
