‘লীগ ব্যাক করেছে অনেক আগেই’—মবতন্ত্র, আমলাতন্ত্র আর সাংস্কৃতিক সংকট নিয়ে মাহফুজ আলমের বিস্ফোরক মন্তব্য

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম (Mahfuz Alam) মনে করেন, আওয়ামী লীগ (Awami League) আসলে অনেক আগেই ‘ব্যাক’ করেছে। তার ভাষ্যে, এই প্রত্যাবর্তন কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক ঘটনা নয়; বরং ধারাবাহিক রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত, মবতন্ত্রের উত্থান, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে আঘাত এবং জু’\লাই গ’\ণঅ’\ভ্যু’\ত্থানের চেতনাকে আমলাতান্ত্রিক ও গোষ্ঠীগত স্বার্থের কাছে সমর্পণ করার মধ্য দিয়েই সেই পথ তৈরি হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৯ মে) নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি দীর্ঘ বিশ্লেষণধর্মী মন্তব্যে এসব কথা বলেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগ কেবল একটি রাজনৈতিক দল নয়, এটি এক ধরনের “ধর্মতত্ত্ব”, আর সেই ধর্মতত্ত্বে মানুষের ‘ঈমান’ ফিরে এসেছে।

মাহফুজ আলমের মতে, লীগ সেদিনই ফিরে আসা শুরু করে যেদিন ‘২৪-এর গ’\ণঅ’\ভ্যু’\ত্থানকে ‘৭১-এর বিপরীতে দাঁড় করানো হয়েছিল। তিনি লেখেন, আইনের শাসনের পরিবর্তে যখন মবের শাসন প্রতিষ্ঠা পেতে থাকে এবং তথাকথিত ‘মজলুমগণ’ তাতে উল্লাস প্রকাশ করে, তখনই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।

তার পোস্টে ধর্মীয় ও সামাজিক সহিংসতার প্রসঙ্গও উঠে আসে। তিনি অভিযোগ করেন, মাজারে হামলা, মসজিদ থেকে ভিন্নমতাবলম্বীদের বের করে দেওয়া এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়নের ঘটনায় যাদের প্রতিবাদী হওয়ার কথা ছিল, তারা নীরব থেকেছে। এই নীরবতাকেই তিনি লীগের পুনরুত্থানের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন।

ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধে বিশ্বাসীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার কথাও উল্লেখ করেন সাবেক এই উপদেষ্টা। তার ভাষায়, সরকার-প্রযোজিত ডানপন্থার উত্থান এবং “মবস্টারদের” নায়ক বানানোর সংস্কৃতি সেক্যুলার জনগোষ্ঠীর মধ্যে গভীর ভয় তৈরি করেছে। আর সেই মুহূর্তেই, তার মতে, লীগ কার্যত ফিরে এসেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের অভ্যন্তরীণ কাঠামো নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন মাহফুজ আলম। তিনি লেখেন, সরকার যখন রাজনৈতিক চরিত্র হারিয়ে পুরোপুরি আমলাতান্ত্রিক রূপ নিতে শুরু করে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে “আমলানির্ভর কিচেন ক্যাবিনেট”, তখন থেকেই সংকট গভীর হয়। তার অভিযোগ, সেই কিচেন ক্যাবিনেটের অনেক সদস্যই ছিলেন বিএনপি (BNP), জামায়াতে ইসলামী (Jamaat-e-Islami) অথবা আওয়ামী লীগের “ছুপা দালাল”।

তার দাবি, এসব গোষ্ঠীর কাছে জু’\লাই ছিল কেবল নিজেদের পরিবার, প্রজন্ম ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষার একটি মাধ্যম।

জু’\লাই ঘোষণাপত্র ও সনদের প্রক্রিয়া নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। লেখেন, যখন এই পুরো প্রক্রিয়া আমলাতন্ত্র ও ভেস্টেড ইন্টারেস্ট গ্রুপের হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং নির্বাচনী বাটোয়ারার মাধ্যমে সংস্কার ও বিচার প্রশ্নে আপোষ করা হয়, তখন থেকেই লীগের প্রত্যাবর্তনের পথ আরও প্রশস্ত হয়। তার ভাষায়, সংস্কার ও বিচারকে তখন বিএনপি-জামাতের রাজনৈতিক দরকষাকষির হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছিল।

শিক্ষার্থীদের ভূমিকাও তার সমালোচনা থেকে বাদ যায়নি। মাহফুজ আলম লেখেন, ছাত্ররা যখন বিপ্লবী সাংগঠনিক শক্তিতে পরিণত না হয়ে “লুম্পেন চরিত্রের ক্লাব” ও মবে রূপ নেয় এবং ক্যাম্পাসে গণতন্ত্রের বদলে সংঘতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়, তখনই লীগ ব্যাক করেছে।

মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও মিডিয়ায় “প্রযোজিত হামলা”, নতুন মিডিয়ার অনুমোদনে কিচেন ক্যাবিনেটের বাধা এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদকে মোকাবেলার নামে পশ্চাৎমুখী সাংস্কৃতিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীলতা—এসবই রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বদলে দিয়েছে।

এছাড়া কমিশন, ট্রাইব্যুনাল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে একটি নির্দিষ্ট আদর্শিক গোষ্ঠীর ক্ষমতায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও করেন তিনি। তার মতে, জু’\লাই গ’\ণঅ’\ভ্যু’\ত্থানে সক্রিয় সাংস্কৃতিক ও মেধাবী মানুষদের বাদ দিয়ে “জিরো কন্ট্রিবিউশন গুপ্তদের” ক্ষমতায়িত করাও লীগের পুনরুত্থানের আরেকটি কারণ।

দীর্ঘ পোস্টের শেষদিকে কিছুটা রসাত্মক ভঙ্গিতে মাহফুজ আলম লেখেন, “মূল কথাই বলা হয়নি—লীগ ফেরত আসবে, কারণ সব দোষ মাহফুজ আলমের।”