‘তেলাপোকা’ মন্তব্য থেকে ডিজিটাল ঝড়, ভারতে ব্যঙ্গের রাজনীতিতে নতুন নাম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’

একটি সাধারণ রসিকতা যে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ভারতের রাজনীতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং তরুণ সমাজের ক্ষোভের প্রতীক হয়ে উঠবে—সম্ভবত এমন কিছুর ধারণাও ছিল না এর নির্মাতা অভিজিৎ দিপকে (Abhijit Dipke)-এর। ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে ঘিরে মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জন্ম নিয়েছে ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক উদ্যোগ ‘ককরোচ জনতা পার্টি’, যা ইতোমধ্যে লাখো তরুণকে এক ছাতার নিচে টেনে এনেছে।

ঘটনার শুরু গত শুক্রবার। সূর্য কান্ত (Surya Kant), ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি, এক উন্মুক্ত আদালত শুনানিতে কর্মহীন ও পেশাগতভাবে অনিশ্চয়তায় থাকা কিছু তরুণকে ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করেন।

তিনি বলেন, কিছু তরুণ তেলাপোকার মতো আচরণ করছে, যাদের কোনো নির্দিষ্ট পেশাগত অবস্থান নেই। তারা গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা তথ্য অধিকার কর্মীর পরিচয়ে অন্যদের আক্রমণ করছে বলেও মন্তব্য করেন।

তবে বক্তব্যটি দ্রুতই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। পরে প্রধান বিচারপতি ব্যাখ্যা দেন, তার মন্তব্যটি সাধারণ তরুণদের উদ্দেশে নয়, বরং প্রতারণার মাধ্যমে ডিগ্রি অর্জনকারীদের লক্ষ্য করে করা হয়েছিল। কিন্তু ততক্ষণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

অনেকের মতে, এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi) সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো বিষয়গুলো নিয়ে তরুণদের মধ্যে আগে থেকেই অসন্তোষ জমে ছিল। ফলে এই মন্তব্য তাদের ক্ষোভকে আরও উসকে দেয়।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করা ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দিপকে গত শনিবার এক্সে একটি সংক্ষিপ্ত পোস্ট করেন—“সব তেলাপোকা যদি এক হয়ে যায়, তাহলে কেমন হবে?”

এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর টুল ব্যবহার করে তিনি দ্রুত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র ইশতেহার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উপস্থিতি তৈরি করেন। নামটিও ছিল ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (Bharatiya Janata Party-BJP)-এর একটি ব্যঙ্গাত্মক সংস্করণ।

এরপর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ঘটতে থাকে অপ্রত্যাশিত বিস্ফোরণ। মাত্র তিন দিনের মধ্যে দলটির অনুসারী সংখ্যা ৩০ লাখ অতিক্রম করে। অনলাইন ফর্মের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ সদস্য হওয়ার আগ্রহ দেখান।

আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তিত্বও। তাদের মধ্যে রয়েছেন সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র, সাবেক সংসদ সদস্য কীর্তি আজাদ এবং অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আশিস জোশী।

আশিস জোশী আল-জাজিরাকে বলেন, গত এক দশকে ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় যে ভয়ের সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় বিভাজন তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে এই উদ্যোগ যেন এক নির্মল বাতাসের মতো অনুভূত হচ্ছে। তার ভাষায়, তেলাপোকা এমন একটি প্রাণী, যা সবচেয়ে প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে।

প্রবীণ আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী প্রশান্ত ভূষণও এই বিতর্ক নিয়ে সমালোচনা করেছেন। তার মতে, আন্দোলনকারী তরুণদের প্রতি জমে থাকা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন ঘটেছে এই মন্তব্যে।

ইনস্টাগ্রামে নিজেদের পরিচয় দিতে গিয়ে দলটি লিখেছে—‘অলস, বেকার তেলাপোকাদের একটি ইউনিয়ন।’ সেখানে মজার ছলে সদস্য হওয়ার চারটি শর্তও উল্লেখ করা হয়েছে—বেকার হতে হবে, অলস হতে হবে, দীর্ঘ সময় অনলাইনে থাকতে হবে এবং পেশাদারভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করতে জানতে হবে।

দলটির মূলমন্ত্রও সমানভাবে ব্যঙ্গাত্মক—‘তরুণদের, তরুণদের দ্বারা, তরুণদের জন্য একটি রাজনৈতিক মঞ্চ। ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক, অলস।’

তাদের ইশতেহারে করপোরেট স্বার্থ, নির্বাচনী কারচুপির অভিযোগ এবং বিচারকদের অবসরের পর সরকারি পদায়নের বিষয়গুলোকে তীব্র কটাক্ষ করা হয়েছে।

জনপ্রিয় ইউটিউবার মেঘনাদ এস মনে করেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে মানুষ প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে বিকল্প কিছু খুঁজছে। অনেকের কাছে এটি বাস্তব রাজনীতির চেয়েও বেশি অর্থবহ হয়ে উঠছে।

শিকাগো থেকে অভিজিৎ দিপকে বলেছেন, দীর্ঘ সময় মানুষ নীরব ছিল। এখন সময় এসেছে জবাবদিহিতা দাবি করার। একটি সাধারণ কৌতুক হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও, সেটি এখন ভারতের তরুণদের প্রতীকী প্রতিবাদের এক নতুন ভাষায় রূপ নিয়েছে।