ইউরোপজুড়ে যৌনবাহিত রোগ সিফিলিস ও গনোরিয়ার সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ইউরোপীয় রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র (European Centre for Disease Prevention and Control-ইসিডিসি)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দশকের মধ্যে এই দুই রোগের সংক্রমণ এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
স্বাস্থ্য সংস্থাটি জানিয়েছে, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করা, সচেতনতার অভাব এবং নিরাপদ যৌন আচরণে অনীহাই সংক্রমণ দ্রুত বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইউরোপের দেশগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
ইসিডিসির ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ইউরোপে গনোরিয়ায় আক্রা’\ন্ত হয়েছেন ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩১ জন। যা ২০১৫ সালের তুলনায় ৩০৩ শতাংশ বেশি। একই সময়ে সিফিলিসে আক্রা’\ন্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ৫৫৭ জনে, যা এক দশক আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
ইসিডিসির সংক্রামক ও টিকাপ্রতিরোধযোগ্য রোগ ইউনিটের প্রধান ব্রুনো চিয়ানসিও (Bruno Ciancio) বলেন, এই রোগগুলো দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ্যত্ব, গুরুতর শারীরিক জটিলতা এবং স্থায়ী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। চিকিৎসা ছাড়া সিফিলিস হৃদ্যন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্রে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জন্মগত সিফিলিসে আক্রা’\ন্ত নবজাতকের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীর থেকে শিশুর দেহে এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে শিশুর দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক জটিলতা তৈরি হতে পারে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সংক্রমণের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে স্পেন (Spain)। ২০২৪ সালে দেশটিতে ৩৭ হাজার ১৬৯টি গনোরিয়া এবং ১১ হাজার ৫৫৬টি সিফিলিস সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সমকামী পুরুষ এবং পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়িত পুরুষদের মধ্যে এই দুই রোগের সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি। তবে সন্তান জন্মদানে সক্ষম নারীদের মধ্যেও সিফিলিসের হার বাড়তে থাকায় নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে ক্ল্যামাইডিয়া এখনো ইউরোপের সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া ব্যাকটেরিয়াজনিত যৌনরোগ। যদিও ২০১৫ সালের তুলনায় এর সংক্রমণ প্রায় ৬ শতাংশ কমে ২ লাখ ১৩ হাজার ৪৪৩ জনে নেমে এসেছে।
ব্রেক্সিটের কারণে এই গবেষণায় যুক্তরাজ্য (United Kingdom)-এর তথ্য অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তবে দেশটির স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শুধু ইংল্যান্ডেই ২০২৪ সালে ৭১ হাজার ৮০২ জন গনোরিয়া এবং ৯ হাজার ৫৩৫ জন সিফিলিসে আক্রা’\ন্ত হয়েছেন। একই সময়ে ক্ল্যামাইডিয়ায় আক্রা’\ন্তের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৬৮ হাজার ৮৮৯ জন।
ক্রমবর্ধমান সংক্রমণ ঠেকাতে ২০২৫ সালে বিশ্বের প্রথম গনোরিয়া প্রতিরোধী ভ্যাকসিন কর্মসূচি চালু করেছে যুক্তরাজ্য সরকার (UK Government)।
চিকিৎসকদের মতে, এই রোগ দুটি শুরুতে অনেক সময় শনাক্ত করা কঠিন হয়। গনোরিয়ায় যৌনাঙ্গে ব্যথা, অস্বাভাবিক তরল নিঃসরণ ও জ্বালাপোড়া দেখা দিতে পারে, যদিও অনেকের ক্ষেত্রে কোনো উপসর্গ থাকে না। অন্যদিকে সিফিলিসে যৌনাঙ্গ বা মুখে ঘা, শরীরে র্যাশ, চুল পড়া ও জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, নিরাপদ যৌন আচরণ, নিয়মিত কনডম ব্যবহার এবং সামান্য উপসর্গ দেখা দিলেই পরীক্ষা করানো জরুরি। কারণ দ্রুত শনাক্ত করা গেলে অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে এই রোগগুলোর কার্যকর চিকিৎসা সম্ভব।


