কুমিল্লা জেলা পরিষদের অর্থ নিয়ে বিতর্ক, মোস্তাক মিয়ার বক্তব্য ঘিরে আসিফ-হাসনাতের পাল্টা ব্যাখ্যা

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া (Asif Mahmud Sajeeb Bhuiyan) এবং এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ (Hasnat Abdullah)-কে ঘিরে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। কুমিল্লা জেলা পরিষদের বর্তমান প্রশাসক মো. মোস্তাক মিয়া (Md. Mostak Mia) অভিযোগ করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা থাকাকালে আসিফ মাহমুদ জেলা পরিষদ থেকে ১৫ কোটি টাকা নিয়েছেন এবং হাসনাত আবদুল্লাহ নিয়েছেন ১০ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক পদেও দায়িত্ব পালন করা মোস্তাক মিয়ার এই বক্তব্যের ৫১ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

শনিবার দুপুরে কুমিল্লা শিল্পকলা একাডেমিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (Bangladesh Nationalist Party – BNP)-এর প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (Ziaur Rahman)-এর ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।

মোস্তাক মিয়া বলেন, “আমার জেলা পরিষদ থেকে মুরাদনগরের আসিফ মাহমুদ আমাদের নিজস্ব রাজস্বের ১৫ কোটি টাকা নিয়ে গেছেন। আরেকজন হাসনাত আবদুল্লাহ, তিনি নিয়ে গেছেন ১০ কোটি টাকা। তারা বৈষম্যবিরোধী সমন্বয়ের রাজনীতির কথা বললেও নিজেদের মধ্যে সেই সমন্বয় ছিল না।”

তার এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর বিষয়টি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান আসিফ মাহমুদ ও হাসনাত আবদুল্লাহ। দুজনই দাবি করেন, আলোচিত অর্থ জেলা পরিষদের নিজস্ব রাজস্ব তহবিলের নয়; বরং স্থানীয় সরকার বিভাগের বিশেষ বরাদ্দ হিসেবে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করা হয়েছে।

নিজের ফেসবুক পেজে লাইভে এসে আসিফ মাহমুদ বলেন, জেলা পরিষদের প্রশাসককে আগে বুঝতে হবে কোন অর্থ এডিপি বরাদ্দ আর কোনটি রাজস্ব তহবিলের অর্থ। তিনি জানান, দায়িত্ব পালনকালে মন্ত্রণালয় থেকে বিভিন্ন উপজেলার জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় কুমিল্লা জেলা পরিষদের মাধ্যমে মুরাদনগর ও দেবিদ্বারেও বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং বিধি অনুযায়ী বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে সেই অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এসব ব্যয়ের প্রয়োজনীয় নথিপত্র জেলা পরিষদের কাছেই সংরক্ষিত রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে হাসনাত আবদুল্লাহ নিজের ফেসবুক পোস্টে দাবি করেন, প্রশাসকের বক্তব্যে একাধিক ভুল তথ্য রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেবিদ্বারের জন্য ১০ কোটি নয়, ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল এবং সেটিও স্থানীয় সরকার বিভাগের এডিপি প্রকল্পের আওতায়। এই অর্থ জেলা পরিষদের নিজস্ব রাজস্ব তহবিল থেকে আসেনি।

হাসনাত আরও বলেন, প্রশাসকের বক্তব্য শুনলে মনে হতে পারে অর্থ ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ করা হয়েছে, অথচ বাস্তবে এই বরাদ্দ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, দেবিদ্বারে বরাদ্দকৃত অর্থ ৪২টি পৃথক প্রকল্পে ব্যবহার করা হয়েছে এবং ব্যক্তি হিসেবে তার বা আসিফ মাহমুদের সঙ্গে সেই অর্থের কোনো আর্থিক সম্পর্ক নেই।

ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, জেলা পরিষদের রাজস্ব খাতের অর্থ বলে বরাদ্দকে উপস্থাপন করা স্পষ্ট মিথ্যাচার। তিনি আরও উল্লেখ করেন, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বিভিন্ন খাতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং প্রতিটি ব্যয়ের সরকারি হিসাব সংরক্ষিত রয়েছে।

পরবর্তীতে প্রশাসক মোস্তাক মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট অর্থ উন্নয়ন কাজের জন্যই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তিনি এও বলেন, তার বক্তব্য হয়তো সম্পূর্ণভাবে প্রকাশিত হয়নি।

তবে শনিবার রাতে নিজের আগের বক্তব্য প্রসঙ্গে নতুন করে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মোস্তাক মিয়া বলেন, জেলা পরিষদের নিজস্ব রাজস্ব তহবিল এবং এডিপির বিশেষ বরাদ্দ—উভয়ই সরকারি অর্থ। তিনি জানান, মুরাদনগর ও দেবিদ্বারে বিশেষ বরাদ্দের আওতায় বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলো তদন্ত করা হবে। তদন্তে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

এদিকে প্রশাসকের বক্তব্য, আসিফ মাহমুদ ও হাসনাত আবদুল্লাহর পাল্টা ব্যাখ্যা এবং বরাদ্দকৃত অর্থের প্রকৃতি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।