ভারতের দ্রুত বিকাশমান ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে বিশাল বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে এয়ারট্রাংক (AirTrunk)। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলীয় বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা (Robin Khuda)-র নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানটি ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের প্রযুক্তি অবকাঠামো খাতে প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় তিন লাখ কোটি রুপি বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে।
কোম্পানিটির ভাষ্য অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ডিজিটাল সেবার দ্রুত সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করেই এই বৃহৎ বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতা ও অর্থায়নে যুক্ত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকস্টোন (Blackstone)।
মোদীর সঙ্গে বৈঠকের পর বড় ঘোষণা
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) এবং দেশটির ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর গত ৫ জুন এই বিনিয়োগ পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়।
এয়ারট্রাংক জানিয়েছে, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় পাঁচ গিগাওয়াট সক্ষমতার ডেটা সেন্টার অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে মোদী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, এমন বিনিয়োগ ভারতকে ক্লাউড কম্পিউটিং ও এআই প্রযুক্তির বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে আরও শক্তিশালী করবে। পাশাপাশি এটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়ন এবং উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে।
মহারাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় প্রকল্প
বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় অংশটি যাচ্ছে ভারতের মহারাষ্ট্র (Maharashtra) রাজ্যে। রাজ্যের উপ-মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ জানিয়েছেন, মুম্বাইয়ের উপকণ্ঠে রায়গড়ে প্রায় দুই লাখ কোটি রুপি ব্যয়ে তিন গিগাওয়াট সক্ষমতার একটি বৃহৎ ডেটা সেন্টার হাব নির্মাণ করবে এয়ারট্রাংক।
সিডনিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত সম্মতিপত্রে সই করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ভারতের ডেটা সেন্টার খাতের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগ প্রকল্প হতে যাচ্ছে।
ভারতের সম্ভাবনায় মুগ্ধ রবিন খুদা
ফোর্বস এশিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রবিন খুদা বলেন, বিশ্বের খুব কম বাজারই রয়েছে যেখানে ভবিষ্যৎ চাহিদা ও ব্যবসায়িক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এতটা সমান্তরালভাবে এগোচ্ছে। তার মতে, ভারতের বিশাল জনসংখ্যা, দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তর এবং এআই প্রযুক্তি নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেশটিকে অনন্য অবস্থানে নিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ভারতের প্রবৃদ্ধির গতিপথ অন্য অনেক দেশের তুলনায় ব্যতিক্রমী। প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো বিনিয়োগের জন্য এটি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় বাজার।
দ্রুত সম্প্রসারণে এয়ারট্রাংক
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া, হংকং, জাপান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং ভারতের বাজারে নিজেদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করছে এয়ারট্রাংক। চলতি বছরের এপ্রিলে প্রতিষ্ঠানটি মুম্বাইভিত্তিক ডেটা সেন্টার ডেভেলপার লুমিনা ক্লাউডইনফ্রা (Lumina CloudInfra)-কে অধিগ্রহণ করে।
লুমিনা ইতোমধ্যে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার ডেটা সেন্টার নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। রবিন খুদার ভাষায়, লুমিনার মাধ্যমে ভারতীয় বাজারে প্রবেশের আগেই তারা দেশটির সম্ভাবনা সম্পর্কে আশাবাদী ছিলেন। সাম্প্রতিক সরকারি আলোচনার পর সেই প্রতিশ্রুতি আরও জোরালো হয়েছে।
কে এই রবিন খুদা?
বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া রবিন খুদা বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম ধনী উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত। ফোর্বসের রিয়েল-টাইম তথ্য অনুযায়ী, তার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
তিনি ২০১৫ সালে এয়ারট্রাংক প্রতিষ্ঠা করেন। তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি অল্প সময়ের মধ্যেই এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যতম শীর্ষ ডেটা সেন্টার অপারেটরে পরিণত হয়।
২০২৪ সালে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলারের এক বড় চুক্তিতে ব্ল্যাকস্টোন ও কানাডা পেনশন প্ল্যান ইনভেস্টমেন্ট বোর্ডের একটি জোট এয়ারট্রাংকের অধিকাংশ মালিকানা অধিগ্রহণ করলেও রবিন খুদা এখনো কোম্পানির উল্লেখযোগ্য শেয়ারধারী হিসেবে রয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে এই মেগা বিনিয়োগ শুধু এয়ারট্রাংকের ব্যবসায়িক সম্প্রসারণই নয়, বরং এআই, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ডেটা অর্থনীতির ভবিষ্যৎ বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।


