ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি (Islami Bank Bangladesh PLC)-এর চেয়ারম্যানসহ পুরো পরিচালনা পর্ষদ বাতিলের পর ব্যাংকটির কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। কয়েক দিন ধরে গ্রাহকদের মধ্যে যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছিল, তার তীব্রতা এখন অনেকটাই কমেছে। ফলে নগদ অর্থ উত্তোলনের চাপ কমার পাশাপাশি গ্রাহকদের একটি অংশ আবারও মেয়াদি আমানত হিসাব সচল করার আগ্রহ দেখাচ্ছেন। একই সঙ্গে অচল হয়ে থাকা এটিএম বুথ এবং অনলাইন ব্যাংকিং সেবাও পুনরায় চালু হয়েছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন শাখা ঘুরে এবং ব্যাংকসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার নগদ অর্থ উত্তোলনের তুলনায় জমা বেশি হয়েছে ৯৬৪ কোটি টাকা। তবে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) এবং রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা স্থানান্তর হওয়ায় দিন শেষে ব্যাংকের নিট অবস্থান প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা ঋণাত্মক ছিল। এর আগে এই ঋণাত্মক অবস্থান প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার মধ্যে ছিল।
ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, আগের কয়েক দিনের আটকে থাকা ইএফটি ও আরটিজিএস লেনদেন ধাপে ধাপে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। এ কারণে কিছুটা চাপ থাকলেও সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।
আবার ফিরছেন আমানতকারীরা
আতঙ্কের কারণে যেসব গ্রাহক সম্প্রতি মেয়াদি আমানত হিসাব ভেঙে ফেলেছিলেন, তাদের একটি অংশ আবার ব্যাংকের দিকে ফিরে আসছেন। ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত কয়েক দিনে বন্ধ হয়ে যাওয়া হিসাবের মধ্যে ৫০২ জন গ্রাহক পুনরায় হিসাব চালু করেছেন। এতে নতুন করে ৪৫ কোটি টাকা জমা পড়েছে।
সোমবার ইসলামী ব্যাংকের এক ঘোষণায় জানানো হয়, বিশেষ পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন হয়ে যারা ১ থেকে ১৫ জুনের মধ্যে মেয়াদি আমানত আগাম নগদায়ন করেছেন, তারা আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে পুনরায় হিসাব সচলের আবেদন করতে পারবেন। এ সময়ের মধ্যে আবেদন করলে আগের সব সুবিধা বহাল রেখে হিসাব পুনরায় চালু করা হবে। সাধারণত মেয়াদ পূর্তির আগে আমানত ভাঙলে সঞ্চয়ী হিসাবের হারে মুনাফা প্রদান করা হয়। তবে ব্যাংকের এই ঘোষণার পর অনেক গ্রাহক আবার মেয়াদি হিসাব চালুর বিষয়ে যোগাযোগ করছেন।
রাজধানীর হেড অফিস কমপ্লেক্স করপোরেট শাখার প্রধান মোহাম্মদ কুতুবউদ্দিন (Mohammad Kutubuddin) বলেন, আগের তুলনায় অর্থ উত্তোলনের চাপ কমেছে। অনেক গ্রাহক মুদারাবা টার্ম ডিপোজিট রিসিপ্ট (এমটিডিআর) হিসাব পুনরায় চালুর বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন। তিনি জানান, মঙ্গলবার একজন গ্রাহক তার এমটিডিআর হিসাব পুনরায় চালু করে ১০ লাখ টাকা জমা দিয়েছেন।
সচল এটিএম ও অনলাইন সেবা
গত সপ্তাহে ইসলামী ব্যাংকের অধিকাংশ এটিএম বুথ অচল হয়ে পড়েছিল। ফলে গ্রাহকরা বুথ থেকে অর্থ উত্তোলন করতে পারেননি। তবে মঙ্গলবার মতিঝিল এলাকায় দেখা গেছে, ব্যাংকের এটিএম বুথগুলো আবার সচল হয়েছে এবং গ্রাহকরা স্বাভাবিকভাবে লেনদেন করছেন।
কারওয়ান বাজার শাখার গ্রাহক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, তিনি মঙ্গলবার অনলাইনে তিন লাখ টাকা অন্য একটি হিসাবে স্থানান্তর করতে সক্ষম হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও গ্রাহকদের আস্থা ফিরে আসার ইঙ্গিত মিলছে। আজাদুল ইসলাম আদনান নামে একজন ফেসবুকে লিখেছেন, পর্ষদ পরিবর্তনের পর ইসলামী ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন তিনি। এতে তার মধ্যে নতুন করে আস্থা তৈরি হয়েছে।
এদিকে ইসলামী ব্যাংকের রংপুর ধাপ শাখার এক গ্রাহক ৯ জুন ৩ লাখ টাকার এমটিডিআর ভেঙে নিয়েছিলেন। পরে ব্যাংকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি পুনরায় সেই অর্থ জমা দিয়েছেন বলে জানান শাখার কর্মকর্তারা।
ব্যাংকের লোকাল অফিসের প্রধান জাকির হোসাইন (Zakir Hossain) বলেন, আগের তুলনায় নগদ অর্থ উত্তোলনের চাপ কমেছে। ফিক্সড ডিপোজিট ভাঙানোর প্রবণতাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে এটিএম বুথ ও অনলাইন ব্যাংকিং সেবা সচল রয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন মজুমদার (Mohammad Jamal Uddin Majumdar) বলেন, গ্রাহকরা এখন এটিএম বুথ থেকে লেনদেন করতে পারছেন এবং তাদের মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। অনলাইন ব্যাংকিং সেবাও চালু রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তার কারণে পুরো পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। খুব শিগগিরই অনলাইন লেনদেন পূর্ণাঙ্গভাবে উন্মুক্ত করে দেওয়া সম্ভব হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
পটভূমিতে যে সংকট
ঈদের আগে শেষ কর্মদিবস ২৪ মে সন্ধ্যার পর বাংলাদেশ ব্যাংক (Bangladesh Bank)-এর সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে গত ১ জুন থেকে একদল গ্রাহক আন্দোলন শুরু করেন। এর পরপরই আতঙ্কে বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন হওয়ায় তারল্য সংকটে পড়ে ব্যাংকটি। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে গত সপ্তাহে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ধারও চায় তারা।
গত রোববার ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য পর্ষদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন না হওয়া পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করবেন।
সোমবার তিনি ব্যাংকে গিয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে সাংবাদিকদের জানান, যোগ্য ও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে দ্রুত পাঁচ সদস্যের একটি পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গঠনের প্রক্রিয়া চলছে।
তিনি বলেন, এখন পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই। আমানতকারীদের নির্বিঘ্নে লেনদেন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি ব্যাংকের প্রতি আস্থা রাখার অনুরোধ করেন।
