একটি আত্মনির্ভর, জলবায়ু-সহিষ্ণু, প্রযুক্তিনির্ভর এবং কৃষক-কেন্দ্রিক আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলাই সরকারের মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman)। তিনি বলেছেন, এমন একটি কৃষি কাঠামো গড়ে তোলা হবে যেখানে উৎপাদন ও বিপণন হবে তথ্যনির্ভর, প্রান্তিক কৃষকরা হয়ে উঠবেন ক্ষমতায়িত উদ্যোক্তা এবং কৃষিখাত জাতীয় সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।
বুধবার (১৭ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের নবম দিনের প্রশ্নোত্তর পর্বে ‘আই হ্যাভ অ্য প্লান’ শীর্ষক এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। বিকেল ৩টায় শুরু হওয়া অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল (Barrister Kaiser Kamal)। রাষ্ট্রীয় কাজে ঢাকার বাইরে থাকায় প্রধানমন্ত্রী সংসদে উপস্থিত ছিলেন না, তবে তার লিখিত উত্তর সংসদের টেবিলে উপস্থাপন করা হয়।
সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. সেলিম রেজা (Md. Selim Reza) কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী তার জবাবে কৃষি খাতে চলমান ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেন।
তিনি জানান, কৃষকদের ইউনিক পরিচয় নিশ্চিত করা, ভর্তুকি ও প্রণোদনা সহজতর করা, ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ সরবরাহ এবং কৃষিযন্ত্র ব্যবহারে সহায়তার লক্ষ্যে ১৪ এপ্রিল ২০২৬ কৃষক কার্ড বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়েছে। বর্তমানে দেশের আট বিভাগের ১০ জেলার ১১ উপজেলায় প্রি-পাইলটিং পর্যায়ে এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ পর্যন্ত ২০ হাজার ৮৩২টি কৃষক কার্ড বিতরণ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, সরকার ইতোমধ্যে শস্য, ফসল, পশুপালন ও মৎস্যখাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সম্পূর্ণ মওকুফ করেছে। এ লক্ষ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ হাজার ৫৬৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর ফলে প্রায় ১৩ লাখ ১৭ হাজার ৫০০ কৃষক উপকৃত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
কৃষি উৎপাদন ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নে দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, এই কর্মসূচির মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে, জলাবদ্ধতা হ্রাস পাবে, সেচ সুবিধা বাড়বে এবং গ্রামীণ পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সরকার ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সার সুলভ মূল্যে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি বিএডিসির মাধ্যমে উচ্চফলনশীল ও জলবায়ু-সহিষ্ণু বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করার কথাও জানানো হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, উচ্চফলনশীল ও প্রতিকূলতা-সহিষ্ণু নতুন জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি স্মার্ট কৃষি এবং প্রিসিশন এগ্রিকালচারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ও গম সংগ্রহ এবং দেশব্যাপী ‘কৃষকবাজার’ স্থাপনের উদ্যোগও বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
এ ছাড়া কৃষিখাতে সেন্সর প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) এবং ড্রোন ব্যবহারের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
একই অধিবেশনে টাঙ্গাইল-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. রবিউল আওয়াল (Md. Robiul Awal) জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় সরকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী বিস্তারিত উত্তর দেন।
তারেক রহমান বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান, ঘনবসতি, বিস্তৃত নদ-নদী ব্যবস্থা এবং উপকূলীয় বৈশিষ্ট্যের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, আকস্মিক বন্যা, নদীভাঙন, খরা, অতিবৃষ্টি, বজ্রপাত, তাপপ্রবাহ ও লবণাক্ততার মতো দুর্যোগের তীব্রতা বাড়ছে, যা মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, অবকাঠামো ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে।
তিনি জানান, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে পদ্মা ব্যারেজ, তিস্তা মহাপরিকল্পনা, নদীভাঙন রোধ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষিজমির লবণাক্ততা হ্রাসে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ১৩ মে ৩৪ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্পের প্রথম পর্যায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতে পানি সংরক্ষণ ও প্রবাহ বৃদ্ধি, দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ততা কমানো, সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধার, নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা হ্রাস এবং সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ সম্ভব হবে।
তিনি আরও জানান, প্রকল্পটি থেকে ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে এবং দেশের জিডিপিতে অতিরিক্ত ০.৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি যুক্ত হতে পারে। পাশাপাশি নদী-নালা, খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।
জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের অন্যান্য উদ্যোগ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরে দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। জাতীয় পর্যায় থেকে শুরু করে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বৃক্ষমেলার আয়োজন এবং তিন মাসব্যাপী বৃক্ষরোপণ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট (Bangladesh Climate Change Trust)-এর মাধ্যমে গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রশিক্ষণ ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। উপকূলীয় জেলাগুলোতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য গ্রামীণ প্রাকৃতিক জলাধার গড়ে তোলার পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে নিরাপদ পানীয় জলের সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।
