দেশের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত এবং বৃহত্তম আর্থিক কেলেঙ্কারি বাংলাদেশ ব্যাংক (Bangladesh Bank) রিজার্ভ চুরি মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির দাবি করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তদন্ত শেষে প্রায় দেড়শ পৃষ্ঠার একটি খসড়া অভিযোগপত্র (চার্জশিট) প্রস্তুত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আইনি মতামতের জন্য খসড়া অভিযোগপত্রটি সম্প্রতি অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।
খসড়া অভিযোগপত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান (Dr. Atiur Rahman)-সহ দেশি-বিদেশি মোট ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, রিজার্ভ চুরির ঘটনা গোপন রাখার বিষয়ে তৎকালীন গভর্নরের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে তাকে পলাতক হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম শাখার অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল মামুন (Al Mamun) বর্তমানে মামলাটির তদন্ত তদারকি করছেন। তিনি জানিয়েছেন, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় আইনি মতামত ও অনুমোদন পাওয়ার পর আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।
বাংলাদেশি অভিযুক্তদের তালিকায় আরও রয়েছেন সাবেক ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম, সাবেক নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা, মেজবাউল হক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান, সাবেক মহাব্যবস্থাপক এ এফ এম আসাদুজ্জামান এবং উপপরিচালক জোবায়ের বিন হুদা। এছাড়া কে এম আব্দুল ওয়াদুদ, রেজাউল করিম ও মো. সুলতান মাসুদ আহমেদ নামের আরও তিন বাংলাদেশির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যদিও তাদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
তদন্তে উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধী চক্রের সম্পৃক্ততার বিষয়ও। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন ভারতের নাগরিক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক আইটি উপদেষ্টা রাকেশ আস্থানা (Rakesh Asthana)। অভিযোগ রয়েছে, রিজার্ভ চুরির ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর তাকে প্রধান করে একটি ফরেনসিক অডিট কমিটি গঠন করা হয়েছিল এবং সেই প্রক্রিয়ার আড়ালে ডিজিটাল আলামত মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়।
হ্যাকিং, অর্থ পাচার ও চুরির অভিযোগে ভারতের আরও চার নাগরিক—প্রীতম রেড্ডি, সুধীন্দ্র আথ্রেশ, নীলভান্নান এবং মাদুক্কুর আনন্দনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধী সংগঠন ল্যাজারাস গ্রুপ (Lazarus Group) ও এর সদস্য পার্ক জিন হিয়োকসহ উত্তর কোরিয়ার দুটি প্রতিষ্ঠানকেও দায়ী করা হয়েছে।
তালিকায় চীনের গাও শুহুয়াসহ আরও দুজন নাগরিক এবং জাপানের সাসাকি নামের এক ব্যক্তির নাম রয়েছে। এছাড়া চুরি হওয়া অর্থের একটি অংশ শ্রীলঙ্কায় পাচারের অভিযোগে হেগোডা গামাগে শ্যালিকা পেরেরাসহ আট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ফিলিপাইনের সোলেয়ার রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনো (Solaire Resort and Casino) এবং কাম সিন অংসহ আরও ৩৬ বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ক্যাসিনো ব্যবসার আড়ালে অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল বলে তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে সুইফট পেমেন্ট ব্যবস্থায় ভুয়া নির্দেশনা পাঠিয়ে ১০১ মিলিয়ন ডলার সরিয়ে নেয় হ্যাকাররা। পরে মাত্র ৩৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনো ৬৬ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার উদ্ধার হয়নি।
ঘটনার ৩৯ দিন পর মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর দীর্ঘ সময় তদন্ত চললেও মামলাটি কার্যত ঝুলে ছিল।
তদন্তে নতুন গতি আনতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত বছরের ১১ মার্চ ড. আসিফ নজরুল (Dr. Asif Nazrul)-কে প্রধান করে একটি বিশেষ পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে। কমিটির সদস্য এবং প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানিয়েছেন, সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা অতিরিক্ত ডিআইজি রায়হান উদ্দিন খান অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছিলেন।
তার দাবি, তদন্তে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম উঠে আসায় তদন্ত কর্মকর্তাকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল এবং কয়েকজন বাংলাদেশির নাম বাদ দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়। পরে তাকে তদন্ত থেকে সরিয়ে দিয়ে মামলার গতিপথ ভিন্ন খাতে নেওয়ারও চেষ্টা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
দীর্ঘ তদন্ত, পুনর্মূল্যায়ন এবং বিশেষ পর্যালোচনা কমিটির তত্ত্বাবধানের পর অবশেষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে খসড়া অভিযোগপত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। এখন আইনি মতামত শেষে আদালতে চূড়ান্ত চার্জশিট দাখিলের অপেক্ষা।
