শুধু নতুন বছরের সূচনা নয়, মুসলিম উম্মাহর জন্য মুহাররম আত্মশুদ্ধি, ইমান নবায়ন এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। বিদায় নিয়েছে ১৪৪৭ হিজরি সন, শুরু হয়েছে ১৪৪৮ হিজরি বছরের প্রথম মাস—মুহাররমুল হারাম। ইসলামের ইতিহাস, ইবাদত ও আধ্যাত্মিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে এ মাসের গুরুত্ব অত্যন্ত ব্যাপক।
আল্লাহ তাআলা বছরের বারো মাসের মধ্যে চারটি মাসকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। মুহাররম সেই সম্মানিত মাসগুলোর অন্যতম। রাসুলুল্লাহ (সা.) (Prophet Muhammad ﷺ) এ মাসকে ‘আল্লাহর মাস’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা এর বিশেষ ফজিলত ও মর্যাদার সুস্পষ্ট প্রমাণ।
মুহাররমের মর্যাদা উপলব্ধি করে যদি একজন মুমিন রোজা, তওবা, ইবাদত এবং নেক আমলে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন এবং গুনাহ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেন, তবে নতুন হিজরি বছর তার জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। ইসলামী শিক্ষার আলোকে মুহাররম মাসের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ আমল তুলে ধরা হলো।
প্রথমত, এ মাসে বেশি বেশি নফল রোজা রাখা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। রমজানের পর নফল রোজার মধ্যে মুহাররমের রোজার মর্যাদা সর্বোচ্চ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ رَمَضَانَ شَهْرُ اللَّهِ الْمُحَرَّمُ
“রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজা।” (মুসলিম: ১১৬৩)
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয় যে, রমজানের পর নফল রোজার ক্ষেত্রে মুহাররম মাস বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
দ্বিতীয়ত, আশুরার রোজা পালন করা। মুহাররমের ১০ তারিখ ‘আশুরা’ নামে পরিচিত এবং এ দিনের রোজা বিশেষ ফজিলতপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ
“আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার রোজা বিগত এক বছরের (সগিরা) গুনাহ মাফের কারণ হবে।” (মুসলিম: ১১৬২)
এছাড়া ইহুদিদের সঙ্গে সাদৃশ্য এড়াতে ৯ বা ১১ মুহাররম মিলিয়ে রোজা রাখার নির্দেশও এসেছে। হাদিসে বলা হয়েছে—
صُومُوا يَوْمَ عَاشُورَاءَ وَخَالِفُوا الْيَهُودَ، صُومُوا قَبْلَهُ يَوْمًا أَوْ بَعْدَهُ يَوْمًا
“তোমরা আশুরার রোজা রাখো এবং ইহুদিদের বিরোধিতা করো; এর আগে বা পরে আরও একদিন রোজা রাখো।” (মুসনাদে আহমদ: ২১৫৪)
তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো গুনাহ ও অন্যায় থেকে দূরে থাকা। মুহাররম আশহুরুল হুরুম বা সম্মানিত চার মাসের একটি। এ মাসে অন্যায় ও পাপাচার থেকে বেঁচে থাকার গুরুত্ব আরও বেশি। আল্লাহ তাআলা (Allah)-র বাণী—
إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا … مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنفُسَكُمْ
“আল্লাহর বিধানে মাসের সংখ্যা বারোটি। এর মধ্যে চারটি সম্মানিত মাস। সুতরাং তোমরা এ মাসগুলোতে নিজেদের প্রতি জুলুম করো না।” (সুরা আত-তাওবা: ৩৬)
তাই ঝগড়া-বিবাদ, অন্যায়, অশ্লীলতা এবং সব ধরনের গুনাহ থেকে দূরে থাকা একজন মুমিনের কর্তব্য।
চতুর্থত, তওবা-ইস্তিগফার ও নেক আমল বৃদ্ধি করা। মুহাররম আত্মশুদ্ধির এক অনন্য সময়। এ মাসে কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া, সদকা এবং তওবা-ইস্তিগফার বাড়ানো উচিত। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَمَا يَزَالُ عَبْدِي يَتَقَرَّبُ إِلَيَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى أُحِبَّهُ
“আমার বান্দা নফল আমলের মাধ্যমে ক্রমাগত আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে, অবশেষে আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি।” (বুখারি: ৬৫০২)
অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
فَإِنَّهُ شَهْرُ اللَّهِ الْمُحَرَّمُ، وَفِيهِ يَوْمٌ تَابَ اللَّهُ فِيهِ عَلَى قَوْمٍ وَيَتُوبُ فِيهِ عَلَى آخَرِينَ
“এটি আল্লাহর মাস মুহাররম। এ মাসে এমন একটি দিন রয়েছে, যেদিন আল্লাহ একটি জাতির তওবা কবুল করেছিলেন এবং ভবিষ্যতেও অন্যদের তওবা কবুল করবেন।” (তিরমিজি: ৭৪১)
পঞ্চমত, মুহাররমের মর্যাদা রক্ষা এবং কুসংস্কার পরিহার করা। সমাজে মুহাররমকে ঘিরে নানা ধরনের ভিত্তিহীন প্রথা ও কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে। একজন মুসলিমের দায়িত্ব হলো কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এ মাসের প্রকৃত গুরুত্ব অনুধাবন করা এবং বিদআত ও কুসংস্কার থেকে দূরে থাকা।
আশুরার দিন হজরত মুসা (আ.) (Prophet Musa AS) ও বনি ইসরাঈলকে জালিম ফিরআউনের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন আল্লাহ তাআলা। পবিত্র কুরআনে এসেছে—
فَغَشِيَهُم مِّنَ الْيَمِّ مَا غَشِيَهُمْ
“অতঃপর সমুদ্র তাদেরকে এমনভাবে গ্রাস করল, যা তাদের সম্পূর্ণরূপে নিমজ্জিত করে দিল।” (সুরা ত্বহা: ৭৮)
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) (Ibn Abbas RA) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে দেখলেন ইহুদিরা আশুরার রোজা পালন করছে। তারা জানায়, এ দিন আল্লাহ মুসা (আ.) ও তাঁর সম্প্রদায়কে মুক্তি দিয়েছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
أَنَا أَحَقُّ بِمُوسَى مِنْكُمْ
“মুসার সঙ্গে তোমাদের চেয়ে আমার সম্পর্ক অধিক ঘনিষ্ঠ।”
এরপর তিনি নিজে আশুরার রোজা রাখেন এবং সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দেন। (বুখারি: ২০০৪, মুসলিম: ১১৩০)
মুহাররম তাই কেবল একটি নতুন বছরের সূচনামাত্র নয়; এটি আত্মসমালোচনা, তওবা, ইবাদত এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নতুন অঙ্গীকারেরও সময়। এ মাসের ফজিলতপূর্ণ আমলগুলো যথাযথভাবে পালন করতে পারলে একজন মুমিনের আধ্যাত্মিক জীবন আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।
