প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীন যাচ্ছেন তারেক রহমান (Tarique Rahman)। আগামীকাল রোববার দুপুরে তিনি রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকা থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। সফরের দ্বিতীয় দিন ২২ জুন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম (Anwar Ibrahim)-এর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেবেন তিনি। সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, এই সফরকে কেন্দ্র করে প্রায় দুই বছর ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার পথ তৈরি হতে পারে।
একাধিক জনশক্তি রপ্তানিকারক মনে করছেন, সফরটি শুধু কূটনৈতিক নয়, অর্থনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। ২৩ জুন কুয়ালালামপুর থেকে প্রধানমন্ত্রী চীনের উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন। ২৬ জুন শি জিনপিং (Xi Jinping)-এর সঙ্গে সাক্ষাতের পর দেশে ফেরার কথা রয়েছে তার। চীন সফরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সেতু, উড়ালসড়ক, পাতাল রেলসহ অবকাঠামো খাতের একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা চাওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, এই সফরের মাধ্যমে মালয়েশিয়া ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও গতিশীল হতে পারে। একদিকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে দেশে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধির নতুন ক্ষেত্র উন্মুক্ত হতে পারে। এ বিষয়ে আজ শনিবার বিস্তারিত জানাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে থাকবেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহাদী আমিন এবং পররাষ্ট্র সচিবসহ উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (BNP) সরকার গঠনের পর তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর কোন দেশে হবে, তা নিয়ে কয়েক মাস ধরেই আলোচনা চলছিল। ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশলের অংশ হিসেবেই মালয়েশিয়াকে প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সফরকালে মালয়েশিয়ার সঙ্গে সংস্কৃতি এবং তথ্য ও সম্প্রচার খাতে দুটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হতে পারে। পাশাপাশি কাউন্টার টেরোরিজম, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনা এবং কয়েকটি নোট অব এক্সচেঞ্জের সম্ভাবনাও রয়েছে। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত আছেন। ফলে নিরাপদ অভিবাসন, কর্মী নিয়োগ ও প্রবাসীদের কল্যাণের বিষয়গুলো দুই সরকারপ্রধানের আলোচনায় গুরুত্ব পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গেও মতবিনিময় করবেন।
মালয়েশিয়া সফর শেষে চীনের দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়ন্সে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। বিশ্ব অর্থনীতি, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি এবং এশিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় অংশ নেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের নেতা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাবনাও রয়েছে। পরে তিনি বুলেট ট্রেনে বেইজিং যাবেন। ২৫ জুন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং একান্ত বৈঠকের কথাও জানা গেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চীন সফরে প্রায় ১৫টি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে। শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গণমাধ্যম ও উন্নয়ন সহযোগিতাসহ বিস্তৃত খাত এতে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। এছাড়া বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ, সবুজ উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব এবং পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধির মতো বিষয়েও সমঝোতার প্রস্তুতি চলছে।
অন্যদিকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ও। যদিও আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা এখনো আসেনি, তবু সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে ইতিবাচক ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালে মালয়েশিয়া কর্মী ভিসায় নতুন প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য দেশটির বাজার কার্যত অচল হয়ে পড়ে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও একাধিক চেষ্টা সত্ত্বেও সেটি পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়নি।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে আলোচনা শুরু করে। গত এপ্রিলে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন মালয়েশিয়া সফর করেন। এরপর থেকেই দ্রুত শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে আশাবাদী বক্তব্য দিয়ে আসছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে রিক্রুটিং এজেন্সি ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের একাংশ সতর্ক করে বলেছেন, অতীতের মতো সিন্ডিকেটনির্ভর পদ্ধতি ফিরে এলে আবারও অনিয়মের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাদের মতে, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া নিশ্চিত না হলে শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার সুফল সাধারণ কর্মীরা পুরোপুরি পাবেন না।
২০২৫ সালের অক্টোবরে মালয়েশিয়া বাংলাদেশকে ১০টি বাধ্যতামূলক শর্তের ভিত্তিতে যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা চেয়ে চিঠি দেয়। পরে কয়েকটি শর্ত শিথিল করার অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ। বর্তমানে ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা মালয়েশিয়ার কাছে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিস (বায়রা) প্রধানমন্ত্রীর কাছে শ্রমবাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত ও সব বৈধ এজেন্সির জন্য সমান সুযোগভিত্তিক করার দাবি জানিয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কুয়ালালামপুরে দুই দেশের সরকারপ্রধানের বৈঠকে শ্রমবাজার ছাড়াও বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, উচ্চশিক্ষা, কৃষি, হালাল খাদ্য, নীল অর্থনীতি, রোহিঙ্গা সংকট এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যু আলোচনায় আসতে পারে।
মালয়েশিয়ায় কর্মরত প্রবাসীরাও সফরটি নিয়ে আশাবাদী। তাদের প্রত্যাশা, শ্রমবাজার, কলিং ভিসা, অবৈধ কর্মীদের বৈধতা এবং প্রবাসী কল্যাণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। কুয়ালালামপুরভিত্তিক ব্যবসায়ী মো. রুহুল আমিনের মতে, দুই দেশের মধ্যে সরাসরি ও স্বচ্ছ কর্মী নিয়োগব্যবস্থা চালু হলে সাধারণ শ্রমিকরা কম খরচে বিদেশে কাজের সুযোগ পাবেন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হকও সম্প্রতি বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর এই সফর একটি বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। সংশ্লিষ্ট মহল এখন দেখছে, কূটনৈতিক এই সফর শেষ পর্যন্ত শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে কতটা বাস্তব অগ্রগতি এনে দিতে পারে।
