রেকর্ড ভাঙা এল নিনোর আশঙ্কা, ২০২৭ সালে আরও ভয়াবহ তাপমাত্রা ও দুর্যোগের সতর্কতা

বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে সক্ষম জলবায়ুগত ঘটনা এল নিনো আবারও শুরু হয়েছে। সম্প্রতি ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (NOAA) নতুন এল নিনোর সূচনার ঘোষণা দিয়েছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এবারের এল নিনো অতীতের বহু রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে এবং এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ, দাবানল ও খাদ্যসংকটের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।

আবহাওয়াবিদদের মতে, পূর্বাভাস অনুযায়ী এল নিনো শক্তিশালী আকার ধারণ করলে এটি গত ৭৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে আফ্রিকা, মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং এশিয়ার বিভিন্ন অংশে খরা ও বন্যার পরিস্থিতি আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এল নিনোর নামকরণের ইতিহাসও বেশ পুরোনো। শত শত বছর আগে পেরুর জেলেরা লক্ষ্য করেছিলেন, কয়েক বছর পরপর বড়দিনের সময় নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে অ্যাঙ্কোভি মাছের পরিমাণ হঠাৎ কমে যায়। তারা এই ঘটনাকে ‘এল নিনো’ নামে ডাকতে শুরু করেন, যার অর্থ ‘শিশু যিশু’।

বর্তমানে এল নিনোকে বৈশ্বিক জলবায়ু ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ চক্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ুর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে সৃষ্টি হয়। এর কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যায় এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার ধরনে বড় পরিবর্তন দেখা দেয়।

এল নিনোর শক্তি নির্ধারণ করা হয় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা কতটা বেড়েছে তার ওপর। সাধারণভাবে দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে সেটিকে শক্তিশালী এল নিনো হিসেবে ধরা হয়। আন্তর্জাতিক আবহাওয়া মডেলগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বাকি সময় এবং ২০২৭ সালের শুরুতে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা গড়ে ২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি, এমনকি ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসও অতিক্রম করতে পারে।

এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হিসেবে ১৯৮২-৮৩ সালের ঘটনাকে ধরা হয়, যখন তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছিল ২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এবারের এল নিনো সেই রেকর্ডও ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনো সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্টি হয় না। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে মিলিত হয়ে এর প্রভাব অনেক বেশি তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৯৭-৯৮ সালের শক্তিশালী এল নিনোর পর ১৯৯৮ সাল সে সময়ের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে রেকর্ড গড়েছিল। একইভাবে ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোর পর ২০১৬ সালেও নতুন উষ্ণতার রেকর্ড তৈরি হয়।

বর্তমানে ২০২৪ সাল সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে রেকর্ডধারী। সে সময় বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। জলবায়ু মডেলগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সাল আরও উষ্ণ হতে পারে।

এল নিনোর প্রভাব সব অঞ্চলে একই রকম হয় না। কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দেয়, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা আঘাত হানে।

গত ৯ জুন জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) সতর্ক করে জানিয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং সাহেল অঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর আগে ২০২৩-২৪ সালের এল নিনোর সময় দক্ষিণ আফ্রিকায় এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ খরা দেখা গিয়েছিল।

এফএওর মতে, সোমালিয়ায় অক্টোবর পর্যন্ত খরা অব্যাহত থাকতে পারে। এরপর ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দীর্ঘ খরার পর অতিবৃষ্টি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। কারণ শুকিয়ে যাওয়া মাটি দ্রুত পানি শোষণ করতে পারে না, ফলে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং এশিয়ার বিভিন্ন এলাকাকেও খরার ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব অঞ্চলের অনেক দেশ ইতোমধ্যে যুদ্ধ, খাদ্যসংকট ও অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে। এর সঙ্গে শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এছাড়া ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জটিলতার কারণে সার সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

অন্যদিকে ইউরোপীয় কমিশন (European Commission) সতর্ক করেছে, সুদান, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, চাদ, ইকুয়েডর, ভেনেজুয়েলা এবং হাইতির মতো দেশগুলো গুরুতর মানবিক সংকটের মুখে পড়তে পারে।

বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী জলবায়ুগত ঘটনা হিসেবে এল নিনো অতীতেও বহু অঞ্চলে ভয়াবহ খরা, বন্যা ও খাদ্যসংকট সৃষ্টি করেছে। ১৯৯৭-৯৮ এবং ২০১৫-১৬ সালের শক্তিশালী এল নিনোর অভিজ্ঞতা সামনে রেখে বিজ্ঞানীরা এবারও একই ধরনের ঝুঁকির সতর্কবার্তা দিচ্ছেন। পূর্বাভাস সত্যি হলে ২০২৭ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড গড়তে পারে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা ও খরার তীব্রতা আরও বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর প্রভাব পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও আগাম প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়। খরাসহিষ্ণু বীজের ব্যবহার, গবাদিপশুর জন্য খাদ্য ও পানি সংরক্ষণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম পরিকল্পনা গ্রহণ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।