লন্ডন সফরের পর কি বদলে গেছে বঙ্গভবন-সরকার সম্পর্ক?

বঙ্গভবনের সঙ্গে বর্তমান সরকারের সম্পর্ক ঠিক কোন অবস্থায় আছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে নানা কানাঘুষা চলছে। সম্পর্ক কি আগের মতোই স্বাভাবিক, নাকি এর মধ্যে শীতলতার ছায়া পড়েছে—এমন প্রশ্নও এখন ঘুরপাক খাচ্ছে। মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান এবং তার আগে-পরে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন (Mohammed Shahabuddin Chuppu)-এর সম্পর্ক বেশ উষ্ণ বলেই মনে হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা সেই সম্পর্কে ধীরে ধীরে বরফ জমার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, চিকিৎসার জন্য রাষ্ট্রপতির লন্ডন সফরের পর থেকেই সরকারের সঙ্গে তার সম্পর্ক আগের তুলনায় অনেকটা শিথিল হয়ে পড়ে। লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি কাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, কোথায় গেছেন কিংবা কী ধরনের কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন—এসব নিয়েও বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে। রাষ্ট্রপতির গতিবিধি নিয়ে একটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল বলেও একটি সূত্র দাবি করেছে।

তবে সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যরা বঙ্গভবনের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্ককে সাংবিধানিক ও স্বাভাবিক সম্পর্ক হিসেবেই দেখছেন। তাদের বক্তব্য, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় বঙ্গভবনের সঙ্গে যতটুকু সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন, সরকারের পক্ষ থেকে তা পুরোপুরিই রক্ষা করা হচ্ছে।

গত ২১ মার্চ সকাল সাড়ে ৮টায় রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে পবিত্র ঈদুল ফিতরের প্রধান জামাতে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman)। সেই জামাতে মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা এবং বিভিন্ন মুসলিম দেশের কূটনীতিকসহ সর্বস্তরের মুসল্লি অংশ নেন। নামাজ শেষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর হৃদ্যতাপূর্ণ কোলাকুলির ছবিও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

এরপর গত ২৮ মে সকাল সাড়ে ৭টায় জাতীয় ঈদগাহে ঈদুল আজহার প্রধান জামাতেও রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী একই কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন। তবে এবার আয়োজকদের পক্ষ থেকে তাদের পাশাপাশি দাঁড়ানোর ব্যবস্থা রাখা হয়নি। রাষ্ট্রপতির নির্ধারিত জায়গা থেকে কিছুটা দূরে প্রধানমন্ত্রীর দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়। এই ব্যবস্থাকেই সরকার ও বঙ্গভবনের মধ্যকার শীতল সম্পর্কের একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন কোনো কোনো রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি (Bangladesh Nationalist Party-BNP)। বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ নেওয়ার প্রচলিত রীতি থেকে সরে এসে ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ ভবনের ঐতিহাসিক দক্ষিণ প্লাজায় খোলা আকাশের নিচে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নেন। শপথ অনুষ্ঠান শেষে জাতীয় সংসদ ভবনে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তারা পরস্পরের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। ওই সময় তারেক রহমানের মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে সালাহউদ্দিন আহমদ ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুও উপস্থিত ছিলেন।

গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে রীতি অনুযায়ী ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ভাষণে তিনি পতিত স্বৈরশাসককে ফ্যাসিস্ট হিসেবে উল্লেখ করেন এবং আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের অপশাসন ও দুঃশাসনের চিত্র তুলে ধরেন। একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ঐতিহাসিক আখ্যা দিয়ে সেই অভ্যুত্থানে শহীদদের আত্মত্যাগের কথাও স্মরণ করেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, হাজার হাজার শহীদের রক্ত ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে তাঁবেদার ও ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে সহস্রাধিক মানুষ শহীদ হয়েছেন। নারী, পুরুষ ও শিশুসহ কমপক্ষে ৩০ হাজার মানুষ আহত ও পঙ্গু হয়েছেন। পাঁচ শতাধিক মানুষ হারিয়েছেন দৃষ্টিশক্তি।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, ত্রয়োদশ সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশন বাংলাদেশের ইতিহাসে গভীর তাৎপর্যপূর্ণ একটি মুহূর্ত। শান্তিপূর্ণ, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে এই গৌরবময় সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে।

রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে নবগঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার এবং সব সংসদ সদস্যকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সংসদ সদস্যরাও রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের সময় টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানান। তবে সরকারের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সম্পর্কের দৃশ্যমান ছন্দপতন ঘটে বাজেট অধিবেশনের দিন।

সংসদ ভবন সূত্র জানিয়েছে, গত ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জাতীয় সংসদ (Jatiya Sangsad)-এ পৌঁছান। সেখানে তিনি সংসদে উত্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা অর্থবিলে স্বাক্ষর করেন। বিলে রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর নেওয়ার জন্য অর্থ সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্ট বক্সে যান।

এরপর বেলা ৩টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি সংসদ কক্ষের প্রেসিডেন্ট বক্সে অবস্থান করলেও সংসদ নেতা, স্পিকার, হুইপ কিংবা সরকারি সংসদীয় দলের কোনো সদস্য তার সঙ্গে দেখা করতে যাননি। বাজেট অধিবেশন শুরু হওয়ার পরও সরকারি দলের কেউ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ না করায় শেষ পর্যন্ত তিনি দ্রুত সংসদ ভবন ত্যাগ করে বঙ্গভবনে ফিরে যান।

এর আগে শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জাতীয় সংসদ ভবনে পৌঁছে নর্থ প্লাজার প্রেসিডেন্সিয়াল স্কয়ার দিয়ে সংসদ ভবনে প্রবেশ করেন রাষ্ট্রপতি। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, বাজেট অধিবেশনের সময় রাষ্ট্রপতি সংসদে এলে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তাকে স্বাগত জানান। এরপর প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে সঙ্গে নিয়ে চলন্ত সিঁড়ি দিয়ে সংসদ কক্ষসংলগ্ন প্রেসিডেন্সিয়াল লবির দিকে এগিয়ে যান। সেখান থেকে রাষ্ট্রপতি সংসদ কক্ষের নির্ধারিত প্রেসিডেন্ট বক্সে গিয়ে আসন গ্রহণ করেন। কিন্তু এবার সেই প্রচলিত আনুষ্ঠানিকতার প্রতিফলন দেখা যায়নি।

নির্বাচনের পর সরে যেতে চেয়েছিলেন

ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর নিজের পদ থেকে সরে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। গত বছরের ১১ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি সেই পরিকল্পনার কথা জানান। সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমি চলে যেতে আগ্রহী। আমি বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে যেতে চাই।’

তবে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার বাধ্যবাধকতার কথাও তিনি ওই সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত নির্বাচন না হয়, ততক্ষণ থাকা উচিত। আমি মূলত সংবিধানসম্মত পদমর্যাদা রক্ষা করার জন্যই এখানে আছি।’

আলোচনার কেন্দ্রে রাষ্ট্রপতির লন্ডন সফর

ফলোআপ চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য গত ৯ মে লন্ডনে যান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। লন্ডনে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনের একটি সূত্র আমার দেশকে জানিয়েছে, চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে রাষ্ট্রপতি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে প্রথমে লন্ডনের বিলাসবহুল হোটেল হিলটনে ওঠেন। সেখানে দুই দিন থাকার পর তারা ক্যামব্রিজের নিউমার্কেট এলাকার বিলাসবহুল রিসোর্ট বেডফোর্ড লজে যান।

ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে হৃদরোগের ফলোআপ চিকিৎসা নেন রাষ্ট্রপতি ও তার স্ত্রী রেবেকা সুলতানা। লন্ডন হাইকমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, শুক্রবার জুমার দিনে রাষ্ট্রপতির পরিবারের সদস্যরা কেনাকাটার জন্য বাইরে যান। যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে রাষ্ট্রপতির প্রটোকল ও চলাচলের জন্য হাইকমিশনের পক্ষ থেকে সাতটি বিলাসবহুল গাড়ি ভাড়া করা হয়। রাষ্ট্রপতির সফরসঙ্গীরা এসব গাড়ি নিয়ে নিজেদের মতো বিভিন্ন স্থানে ঘোরাফেরা করেন।

রাষ্ট্রপতির নয় দিনের এই সফরে প্রায় দুই ডজন সফরসঙ্গীর বিপুল ব্যয় নিয়েও সরকারি পর্যায়ে প্রশ্ন ওঠে। ১৮ মে তিনি দেশে ফেরেন। তবে তার দেশে ফেরার পরও লন্ডন সফর ঘিরে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা ও প্রশ্ন থামেনি।

একটি সূত্রের দাবি, লন্ডনে অবস্থানকালে রাষ্ট্রপতির কোনো কোনো কার্যক্রম সরকারের মনঃপূত হয়নি। এরপর থেকেই বঙ্গভবনের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব দৃশ্যমান হতে শুরু করে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

অস্বস্তির অধ্যায় পেরিয়ে স্বস্তি, তারপর আবার দূরত্ব

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস (Dr. Muhammad Yunus)-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে বঙ্গভবনের সম্পর্ক খুব একটা সুখকর ছিল না। গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের প্রায় আড়াই মাস পর একটি সংবাদপত্র রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে উদ্ধৃত করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি শুনেছেন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন, কিন্তু তার কাছে এ-সংক্রান্ত কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। এই বক্তব্য প্রকাশের পর রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের নেতৃত্বে ছাত্র-জনতার ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা কয়েক দিন বঙ্গভবন ঘেরাও করে রাখেন।

শেখ হাসিনার পদত্যাগের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আনায় অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারাও রাষ্ট্রপতির প্রতি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। ব্যাপক প্রতিক্রিয়া, আলোচনা ও সমালোচনার মুখে বঙ্গভবন থেকে বিষয়টি পরিষ্কার করে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।

সেই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগকেন্দ্রিক মীমাংসিত বিষয় নিয়ে নতুন করে কোনো বিতর্ক সৃষ্টি না করার আহ্বান জানিয়েছেন। বিতর্ক তৈরি করে অন্তর্বর্তী সরকারকে অস্থিতিশীল কিংবা বিব্রত করা থেকে বিরত থাকার জন্যও তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান।

বঙ্গভবনের এই বিবৃতির পর আন্দোলন ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে। কিন্তু সরকারের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা আর পুরোপুরি ঘোচেনি। রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে তার প্রেস বিভাগও সরিয়ে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস, কনস্যুলেট ও হাইকমিশন থেকে রাষ্ট্রপতির প্রতিকৃতি নামিয়ে ফেলা হয়। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও রাষ্ট্রপতি এই প্রসঙ্গটি তুলে ধরেছিলেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির প্রতিকৃতি সব কনস্যুলেট, দূতাবাস ও হাইকমিশনে ছিল। এক রাতে সেগুলো হঠাৎ তুলে ফেলা হয়েছে। এতে জনগণের কাছে ভুল বার্তা যায়—হয়তো রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দেওয়া হবে। এতে আমি গভীরভাবে অপমানিত বোধ করেছি। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে চিঠি লিখেও কোনো প্রতিকার পাইনি।’

আমার দেশকে যা বলেছিলেন রাষ্ট্রপতি

শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের পর আমার দেশ-এর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় নিজের বিভিন্ন আগ্রহ, অভিজ্ঞতা ও ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন। রাত ৮টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত দেড় ঘণ্টার সেই আলাপচারিতায় শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের আগে-পরে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা উঠে আসে।

জুলাই আন্দোলনের শেষ দিনগুলোতে বঙ্গভবনের সঙ্গে শেখ হাসিনার আচরণ এবং দেশে জরুরি অবস্থা জারির জন্য তার পীড়াপীড়ির বিষয়টিও উঠে আসে ওই আলোচনায়। শেখ হাসিনার সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে নিজের মতবিরোধের কথাও অকপটে জানান রাষ্ট্রপতি। কী নিয়ে সেই মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল, তারও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন তিনি।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ৩ আগস্ট থেকে দেশের শাসনভার কার্যত আওয়ামী লীগ সরকারের হাতের বাইরে চলে যায়। এর পেছনের প্রেক্ষাপটও সবার জানা। মূলত রংপুরে আবু সাঈদকে হ’\ত্যা করার ঘটনা দেশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল এবং সর্বস্তরের মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল।

রাষ্ট্রপতি বলেন, একজন শিক্ষার্থীকে এভাবে গু’\লি করে হ’\ত্যা করার ঘটনা দেশের মানুষ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি। আন্দোলন দমন করতে গিয়ে তৎকালীন সরকার ভুল পথে হেঁটেছিল বলেও তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, বঙ্গভবনে বসে পত্রপত্রিকা ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে যতটুকু তথ্য পেয়েছিলেন, তাতেই তার মনে হয়েছিল সরকার আর টিকতে পারবে না। কারণ আন্দোলনে ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ফলে ততদিনে রাজপথ পুরোপুরিই সরকারের বিপক্ষে চলে গিয়েছিল।

শোনা যাচ্ছিল, শেখ হাসিনা দেশত্যাগের দুই দিন আগে রাষ্ট্রপতিকে দেশে জরুরি অবস্থা জারির পরামর্শ দিয়েছিলেন। আমার দেশ-এর পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়, তিনি সেই পরামর্শ গ্রহণ করেননি কেন।

জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, তার কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী তিনি মনে করেছিলেন, জরুরি অবস্থা জারি করেও ছাত্র-জনতার উত্তাল ঢেউ ঠেকানো কারও পক্ষেই সম্ভব হবে না।

প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ ও পদত্যাগপত্র নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের প্রসঙ্গও ওই আলাপচারিতায় উঠে আসে। একটি জাতীয় দৈনিকে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা হয়। ছাত্রদের একটি অংশ রাষ্ট্রপতির পদত্যাগও দাবি করেছিল। এসব ঘটনাকে তিনি কীভাবে দেখেছেন, সেই প্রশ্নেরও জবাব দেন রাষ্ট্রপতি।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনার পতন, পদত্যাগ এবং পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়ার বিষয়গুলো সম্পূর্ণ মীমাংসিত। এসব নিয়ে কোনো ধরনের বিতর্ক কিংবা সন্দেহ সৃষ্টি করার সুযোগ নেই। দেশে নতুন সরকার নিয়োগ হয়েছে, শপথ অনুষ্ঠিত হয়েছে, উপদেষ্টাদের মধ্যে দপ্তর বণ্টন করা হয়েছে এবং সরকার কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। আগের সংসদও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। ফলে এসব বিষয় নিয়ে বিন্দুমাত্র বিতর্কের সুযোগ নেই।

শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের মতামত নেওয়া প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, কর্মজীবনের পুরো সময় তিনি আইন নিয়ে কাজ করেছেন। সে কারণেই শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও নতুন অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের মতামত নেওয়াকে তিনি সমীচীন মনে করেছিলেন।

রাষ্ট্রপতির বক্তব্য অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টই সংবিধানের ব্যাখ্যা দেওয়ার একমাত্র প্রতিষ্ঠান। এ কারণে বঙ্গভবন থেকে সব বিষয় ও প্রেক্ষাপট বিস্তারিত তুলে ধরে সর্বোচ্চ আদালতের মতামত চাওয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পক্ষে সর্বসম্মত মতামত দেওয়ায় তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন। যদিও ওই মতামত না নিলেও কোনো অসুবিধা হতো না, তবু তিনি কোনো অধ্যায় অসম্পূর্ণ রাখতে চাননি। রাষ্ট্র, জনগণ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করার তাগিদ থেকেই তিনি এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

বঙ্গভবনে এখন কেমন আছেন এবং কবে নাগাদ পদ ছাড়তে চান—রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের কাছে এমন প্রশ্নও রাখা হয়েছিল। জবাবে তিনি স্মিত হেসে বলেন, দেশের সর্বোচ্চ পদে থেকে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে রাষ্ট্রের কল্যাণে যতটুকু করা সম্ভব, তার সর্বোচ্চটাই করার চেষ্টা করেছেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘এখন সম্মানের সঙ্গে যেতে চাই। সরকার যখন বলবে, আমি বঙ্গভবন ছাড়তে প্রস্তুত।’

সরকারের স্বাভাবিক রাজনৈতিক কৌশল, বলছেন বিশ্লেষকরা

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ আমার দেশকে বলেন, একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও কাঙ্ক্ষিত মানের নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। সংবিধান ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার পাশাপাশি দলটির নিজস্ব রাজনৈতিক কৌশলও থাকবে। এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটি বিষয়।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বর্তমানে বিএনপি জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকারে এসেছে। রাষ্ট্রপতি পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োজিত হলেও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে তাকে সম্মান করতে হচ্ছে।

তার মতে, রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই বঙ্গভবনের সঙ্গে সরকারের সাংবিধানিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। রাজনৈতিক বাস্তবতা যাই থাকুক, রাষ্ট্রপতির পদ ও সরকারের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ ধরে রাখা সাংবিধানিক কাঠামোরই অংশ।

সাংবিধানিক সম্পর্কের কথাই বলছেন নীতিনির্ধারকরা

বঙ্গভবনের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়ার সম্ভাব্য প্রেক্ষাপট নিয়ে মন্ত্রিসভার কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সদস্যের সঙ্গে কথা বলেছে আমার দেশ। বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে জানতে চাওয়া হয়, লন্ডন সফরের পর রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সরকারের সম্পর্কে কোনো ধরনের শীতলতা তৈরি হয়েছে কি না।

জবাবে প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ বলেন, বঙ্গভবন কিংবা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বর্তমান সরকারের সম্পর্ক সাংবিধানিক। সরকার সেই সাংবিধানিক সম্পর্ক বজায় রেখেই কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

একই প্রশ্ন করা হয়েছিল আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানকে। তবে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বঙ্গভবনের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক প্রসঙ্গে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন আমার দেশকে বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতনের পর দেশে একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে এই গণতন্ত্র অর্জিত হয়েছে।

তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় দেশে অবাধ, গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জননেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াই সাংবিধানিক বিধিবিধানের ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়েছে। এ কারণে তারা সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছেও শুকরিয়া আদায় করছেন।

তথ্যমন্ত্রী আরও বলেন, একদিকে গণঅভ্যুত্থান, অন্যদিকে জুলাইয়ের হাজারো শহীদের রক্ত—সবকিছুকেই দেশের সংবিধান ধারণ করেছে। সেই কারণেই স্বৈরাচারের পতনের পর বঙ্গভবন সংবিধানের রক্ষক হিসেবে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের সর্বসম্মত মতামতের ভিত্তিতে একটি সরকার গঠন করেছে।

তার ভাষ্য, এই মুহূর্তে দেশে একটি কার্যকর সংসদ রয়েছে। সেই সংসদের অভিভাবক হচ্ছে রাষ্ট্র। আর সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের অভিভাবক হচ্ছেন রাষ্ট্রপতি। সরকার বর্তমানে বঙ্গভবন (Bangabhaban)-এর সঙ্গে সাংবিধানিক ও কার্যকর স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রেখেই কাজ করছে বলে তারা বিশ্বাস করেন।