ইরানের আকাশে ভূপাতিত হওয়া একটি মার্কিন যুদ্ধবিমানের পাইলট জরুরি অবতরণের (ইজেক্ট) ঠিক আগে আকাশে এক বিস্ময়কর দৃশ্য দেখেছেন বলে দাবি করেছেন। চারজন সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, তার ভাষ্যমতে, একাধিক ইরানি ড্রোন আকাশে এমনভাবে একত্র হয়েছিল যে পুরো কাঠামোটি দেখতে বিশাল এক ‘জেলিফিশ’-এর মতো মনে হচ্ছিল।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) সিএনএন (CNN)-এর এক প্রতিবেদনে বিষয়টি সামনে আসে। গত এপ্রিলে যুদ্ধবিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর উদ্ধার হওয়া পাইলট মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক ব্রিফিংয়ে প্রথমবারের মতো এই অভিজ্ঞতার কথা জানান। তার এই অস্বাভাবিক পর্যবেক্ষণ এখন যুক্তরাষ্ট্র (United States)-এর গোয়েন্দা মহলে তীব্র আলোচনা, বিশ্লেষণ এবং মতভেদের জন্ম দিয়েছে। এখনো এর কোনো চূড়ান্ত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
পাইলটের বর্ণনার উদ্ধৃতি দিয়ে একটি সূত্র জানায়, ড্রোনগুলো এমনভাবে পরস্পরের সঙ্গে সমন্বিতভাবে চলছিল যেন তারা একটি একক সত্তা। বড় ড্রোনগুলোর নিচে ছোট ড্রোনগুলো জেলিফিশের শুঁড়ের মতো ঝুলে ছিল। পুরো দৃশ্যটি এতটাই অস্বাভাবিক ছিল যে তা দেখে ভিনগ্রহের কোনো প্রযুক্তি বা এলিয়েন সংশ্লিষ্ট কিছুর ধারণাও মনে আসতে পারে। আরেকটি সূত্রের দাবি, ওই সময় পাইলট কার্যত ড্রোনের একটি বিশাল ‘মাইনফিল্ড’-এর মুখোমুখি হয়েছিলেন।
যুদ্ধবিমানটি কেন ভূপাতিত হয়েছিল, সেই তদন্ত এখনো চলমান। তবে প্রাথমিক কিছু বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, ড্রোনের এই রহস্যময় ঝাঁকটি ঘটনাটির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় ইরান (Iran)-এর আকাশসীমায় কোনো মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার এটিই প্রথম ঘটনা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সৌভাগ্যবশত, বিমানে থাকা পাইলট এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা দুজনই নিরাপদে ইজেক্ট করতে সক্ষম হন।
পাইলটকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিশেষ বাহিনী উদ্ধার করতে পারলেও অপর কর্মকর্তা প্রায় একদিন পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপনে থাকার পর উদ্ধার হন। তবে তিনি ড্রোনের ওই অদ্ভুত ঝাঁকটি দেখেছিলেন কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই উদ্ধার অভিযান চলাকালেই একটি মার্কিন এ-১০ বিমানও ভূপাতিত হয়েছিল, যদিও সেই পাইলটও নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন।
ঘটনাটিকে ঘিরে মার্কিন গোয়েন্দা মহলের ভেতরেই বিভক্ত মতামত তৈরি হয়েছে। বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার সময় পাইলট মাথায় আঘাত পেয়েছিলেন। পাশাপাশি, ইরান যুদ্ধ চলাকালে এটি ছিল তার দ্বিতীয়বার ভূপাতিত হওয়ার অভিজ্ঞতা। এর আগে তিনি কুয়েতি বাহিনীর ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’-এর শিকার হয়েছিলেন। ফলে তিনি যা দেখেছেন, তা আদৌ কোনো উন্নত সামরিক প্রযুক্তি ছিল নাকি চরম চাপের মুহূর্তে সৃষ্ট দৃষ্টিভ্রম—সে প্রশ্নও উঠেছে।
প্রযুক্তিগতভাবে ড্রোনের এমন সমন্বিত ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘ওয়ান-টু-মেনি মেশড নেটওয়ার্কিং’। এই পদ্ধতিতে একজন অপারেটর একই সঙ্গে বিপুল সংখ্যক ড্রোন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, এ ধরনের প্রযুক্তি রাশিয়া (Russia) ও চীন (China)-এর হাতে রয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রগুলোর সন্দেহ, এই দুই দেশের প্রযুক্তিগত সহায়তায় ইরান তাদের ড্রোন সক্ষমতাকে আরও উন্নত করেছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং ৬০ দিনের শান্তি আলোচনা চলছে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পারমাণবিক কর্মসূচি, তবে নতুন এই ড্রোন প্রযুক্তি নিয়ে বিতর্ক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ড্রোন যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ এমা বেটস (Emma Bates)-এর মতে, এ ধরনের সমন্বিত ড্রোন নেটওয়ার্ক অত্যন্ত বিপজ্জনক। বিস্ফোরকবাহী ড্রোন যদি দলবদ্ধভাবে আক্রমণ চালায়, তবে তা প্রতিহত করা যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি প্রাণঘাতীও হতে পারে।
এ বিষয়ে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এবং ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স ডিরেক্টরের কার্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ঘটনাটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক প্রতিরক্ষা কৌশল নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনে দিয়েছে।


