পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal)-এর পুরুলিয়া জেলার সুপুরডিহি গ্রামের দরিদ্র মুসলিম বাসনপত্র বিক্রেতা আকবর ঠেলাগাড়িতে করে গ্রামে গ্রামে পণ্য বিক্রি করতেন। সেই আকবরই ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানধারী উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। দীর্ঘ ও অসহনীয় যন্ত্রণার পর তার জীবনের অবসান ঘটেছে। একই জেলার আরেক হতভাগ্য মুসলিম মাইমুরও উগ্রবাদীদের হা’\মলা’\য় গুরুতর আহত হয়েছেন। জীবন ও মৃ’\ত্যু’\র সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তিনি এখন বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ভীতসন্ত্রস্ত মাইমুর পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন-পরবর্তী সহিং’\সতা’\র ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, হা’\মলা’\র সেই মুহূর্তে তার মাথায় একটিই চিন্তা ছিল—যেভাবেই হোক বাঁচতে হবে। ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিতে দিতে হা’\মলা’\কারীরা তাকে ধাওয়া করছিল। কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেবেন, কোথায় লুকাবেন—কিছুই বুঝতে পারছিলেন না তিনি।
মাইমুরের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় থানায় গেলেও পুলিশ তাকে সাহায্য করবে না—এমন আশঙ্কা তার আগে থেকেই ছিল। তারপরও আর কোনো পথ না পেয়ে তিনি থানায় গিয়ে আশ্রয় নেন। কিন্তু নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে পুলিশ তাকেই গরু পাচার মামলার আসামি করে দেয়। সেই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে মাইমুর বলেন, তখনই তার মনে হয়েছে, মুসলিম পরিচয় নিয়ে ভারত (India)-এ বসবাস করাটাই যেন সবচেয়ে বড় অপরাধ।
মাইমুরের এই অসহায় মুখ এখন ভারতের প্রায় ২৫ কোটি মুসলমানের জীবনের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। অসহনীয় যন্ত্রণা, হতাশা, অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্য দিয়েই দিন পার করছেন দেশটির বহু মুসলিম নাগরিক। কখন, কোথায় এবং কোন অজুহাতে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হাতে প্রাণ হারাতে হবে—সেই শঙ্কা যেন প্রতিদিনই তাদের তাড়া করছে। মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয় কিংবা জীবিকা নির্বাহের অবশিষ্ট অবলম্বনও কখন ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানধারীদের বুলডোজারের নিচে চাপা পড়ে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় মুসলমানদের ওপর বহুমাত্রিক নির্যা’\তন ক্রমেই বেড়ে চলেছে। তথাকথিত গোরক্ষা গোষ্ঠী ও বিভিন্ন উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধেও মুসলিমদের ওপর হ’\ত্যা, হেফাজতে নির্যা’\তন এবং বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ উঠছে।
প্রকাশ্য দিবালোকে পি’\টিয়ে হ’\ত্যা’\র ঘটনাও থামছে না। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে অন্তত ২৭ জন মুসলিমকে নির্মমভাবে হ’\ত্যা করা হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন রাজ্যে মুসলমানদের বাড়িঘর ও দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। সাম্প্রতিক সময়ে মুসলিমদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান—মসজিদ, মাদরাসা, দরগাহ, ঈদগাহ, এমনকি কবরস্থানও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। গত দেড় মাসে মসজিদসহ অন্তত ২৩টি মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার তথ্য সামনে এসেছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুসলিম ছাত্রীদের হিজাব পরা, প্রকাশ্য স্থানে নামাজ আদায় কিংবা মসজিদে মাইক ব্যবহারের মতো ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিষয়েও নানা ধরনের বিধিনিষেধ তৈরি করা হচ্ছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জি ঘিরে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর ভীতি ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে ভারতের রাজনীতিতে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব আগের তুলনায় কমেছে। পাঠ্যপুস্তক থেকে মুসলিম শাসকদের ইতিহাস সরিয়ে দেওয়া এবং ঐতিহাসিকভাবে পরিচিত বিভিন্ন শহর, সড়ক, উদ্যান ও স্থাপনার নাম পরিবর্তনের ঘটনাও ধারাবাহিকভাবে ঘটছে। সমালোচকদের মতে, এসব পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে মুসলিমদের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক উপস্থিতিকে ক্রমশ আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদন থেকে মুসলিম নির্যা’\তনে’\র এসব তথ্য সামনে এলেও বাস্তব পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ বলে মনে করছেন অধিকারকর্মীরা। মুসলিমদের হ’\ত্যা ও নির্যা’\তনে’\র ঘটনাগুলো ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সাধারণত ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদাভাবে নথিভুক্ত করে না। দেশটির মূলধারার বহু গণমাধ্যমও বিষয়টি সচেতনভাবে এড়িয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে মুসলিমদের ওপর চলমান নির্যা’\তনে’\র প্রকৃত বিস্তার ও গভীরতা অনেকটাই অজানা থেকে যাচ্ছে।
হ’\ত্যা ও বিচারবহির্ভূত প্রাণহানির হিসাব
সাউথ এশিয়া জাস্টিস ক্যাম্পেইন (South Asia Justice Campaign) প্রকাশিত ‘ইন্ডিয়া পারসিকিউশন ট্র্যাকার’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ভারতে অন্তত ১৭ জন মুসলমানকে হ’\ত্যা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক ঘৃণার কারণে হিন্দু চরমপন্থিদের হাতে ১৩ জনের মৃ’\ত্যু হয়েছে। বিতর্কিত ‘এনকাউন্টার’ ও হেফাজতে নির্যা’\তনে আরও চারজন প্রাণ হারিয়েছেন।
ইন্ডিয়া পারসিকিউশন ট্র্যাকারের আরেক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ভারতজুড়ে মুসলিমদের বিচারবহির্ভূত হ’\ত্যা’\র অন্তত ৫০টি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছিল। এর মধ্যে চরমপন্থি গোষ্ঠীর গণ’\পিটুনি ও আ’\ক্রমণে ২৭টি হ’\ত্যা’\কাণ্ড ঘটে। বাকি ২৩ জনের মৃ’\ত্যু হয় পুলিশি হেফাজতে।
ভারতীয় জনতা পার্টি (Bharatiya Janata Party—BJP)-সমর্থিত বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও বজরং দলের মতো হিন্দু আধিপত্যবাদী উগ্র সংগঠনগুলো দেশজুড়ে, বিশেষ করে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে প্রায় অবাধে কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব সংগঠনের সদস্যরা নানা অজুহাতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলমানদের হেনস্তা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, আ’\ক্রমণ ও হ’\ত্যা অব্যাহত রেখেছে।
পাহালগাম হা’\মলা এবং এর পরিণতিতে পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের পর ভারতজুড়ে হাজার হাজার মুসলমানকে যথেচ্ছভাবে গ্রেপ্তার করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে বিপুলসংখ্যক বাংলাভাষী মুসলমানকে আটক করা হয়। গুজরাট ও আসামে তাদের বসতিগুলোও নির্বিচারে ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া নতুন একটি ‘পুশব্যাক’ নীতির অধীনে যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই অন্তত এক হাজার ৮৮০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ২০০ জন ভারতের নাগরিক ছিলেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
৪৫ দিনে ২৩ মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংস
গত ৪৫ দিনে, অর্থাৎ প্রায় দেড় মাসের মধ্যে ভারতে অন্তত ২৩টি মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব স্থাপনার মধ্যে মসজিদ, মাদরাসা, ঈদগাহ ও দরগাহ রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, উচ্ছেদ ও ধ্বংসের অধিকাংশ ঘটনাই বিজেপি-শাসিত রাজ্যে ঘটেছে।
দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও হরিয়ানা—এই ছয় রাজ্যে ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনাগুলো বেশি ঘটেছে। দিল্লির মঙ্গলপুরীতে অবস্থিত প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো ‘দরগাহ পঞ্চ পীরান’ ভেঙে ফেলা হয়েছে। রাজস্থানের জয়পুরের নূরানি মসজিদ, মুম্বাইয়ের বানের নূরানি মসজ্দ্রা ও গোরেগাঁওয়ের কয়েকটি মসজিদ ও দরগাহ এবং বারাণসীর গঞ্জ শাহিদা মসজিদও ধ্বংস করা স্থাপনার তালিকায় রয়েছে।
ওয়াকফ বোর্ড ও স্থানীয় তত্ত্বাবধায়কদের অভিযোগ, আইনি প্রতিবন্ধকতা এবং স্থাপনাগুলোর ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও কোনো ধরনের পূর্ব নোটিস না দিয়েই তাড়াহুড়া করে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। তাদের ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর ইতিহাস, আইনি অবস্থান বা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অনুভূতির প্রতি কোনো গুরুত্ব দেয়নি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অধিকারকর্মী সংগঠন জাস্টিস ফর অল (Justice For All) ভারতে মসজিদ ভাঙার ঘটনা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংগঠনটি সম্ভল, বারাণসী ও জয়পুরের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে। এক হাজার বছরের পুরোনো মসজিদ থেকে শুরু করে ২০০ বছরের ঐতিহাসিক দরগাহ পর্যন্ত গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে তাদের বিবৃতিতে জানানো হয়।
সংগঠনটির মতে, ভারতের কয়েকটি বিজেপি-শাসিত রাজ্যে মুসলিমদের ধর্মীয় স্থাপনাকে লক্ষ্য করে যে ধ্বংসযজ্ঞ চলছে, তা গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ বলে মনে হচ্ছে না। মে মাস থেকে মাত্র ছয়টি রাজ্যে মসজিদ, দরগাহ, ঈদগাহ ও মাদরাসাসহ অন্তত ২৩টি মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
বারাণসীর এক হাজার বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক গঞ্জ শাহিদা মসজিদও এই ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে। সংস্থাটির বিবৃতিতে বলা হয়, মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে তিনটি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছে। এই প্রবণতা ভারতের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং আইনের চোখে সব নাগরিকের সমান অধিকারের প্রশ্নে গভীর উদ্বেগ তৈরি করছে।
জাস্টিস ফর অল বিশেষভাবে সম্ভলের মসজিদ মুস্তফা কাদরি, বারাণসীর শহীদ আজগাইব মসজিদ এবং জয়পুরের নূরানি মসজিদ ধ্বংসের কথা উল্লেখ করেছে। সংগঠনটি বলেছে, ধর্মীয় স্বাধীনতার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা অবশ্যই সমুন্নত রাখতে হবে। ক্রমবর্ধমান ভাঙচুর ও উচ্ছেদের ঘটনা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের ওপর আ’\ক্রমণ
পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন-পরবর্তী সহিং’\সতা’\য় ক্ষতিগ্রস্ত মুসলিম সম্প্রদায়ের সর্বশেষ পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শনের পর আমার দেশ-এর কলকাতা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে মুসলমানদের ওপর অ’\ত্যাচার শুরু হয়েছে। ভারতের অন্যান্য বিজেপি-শাসিত রাজ্যে অনুসৃত কৌশলের সঙ্গেও এর মিল দেখা যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গে আসামের হিমন্ত বিশ্বশর্মা ও উত্তর প্রদেশের যোগী আদিত্যনাথের বহুল আলোচিত বুলডোজার ও উচ্ছেদ মডেল অনুসরণের পথ বেছে নিয়েছেন। মুসলিম অধ্যুষিত বসতিতে বুলডোজার চালানো হয়েছে। তপশিয়া ও তিলজলার বহুতল ভবনেও হয়েছে বুলডোজার অভিযান। প্রশাসনের দাবি, এসব ভবন অবৈধ ও অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত হয়েছিল।
তপশিয়ায় বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া একটি ফ্ল্যাটের বাসিন্দা মুহাম্মদ ইরফান এখন সহায়-সম্বলহীন। রাতারাতি নিজের ফ্ল্যাট হারিয়ে তিনি তিলজলার একটি ছোট ঘুপচি ঘরে বসবাস করছেন।
ইরফান বলেন, পুরো কলকাতা শহরেই অসংখ্য অবৈধ ও অপরিকল্পিত নির্মাণ রয়েছে। ব্রিটিশ আমল থেকে অনেক ভবনেরই অনুমোদিত পরিকল্পনা নেই। কিন্তু তারা মুসলমান বলেই তাদের বাড়িতে বুলডোজার চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। প্রশাসন তাদের আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় মালামাল সরিয়ে নেওয়ার সময়টুকুও দেয়নি।
তার অভিযোগ, বিজেপি সরকারের পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল নিজে উপস্থিত থেকে উচ্ছেদের কাজ করিয়েছেন। আকস্মিকভাবে ঘর হারিয়ে তারা এখন কোথায় যাবেন বা কীভাবে জীবন শুরু করবেন, সেটিও জানেন না।
ইরফানের মতো অন্তত ৩০ জনের বেশি মানুষ তপশিয়ায় বুলডোজার অভিযানের পর বাড়িছাড়া হয়েছেন। তাদের কেউ আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন, আবার কেউ নতুন বাসস্থানের খোঁজে এলাকা ছেড়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্তদের প্রশ্ন, বড়বাজার কলকাতার সবচেয়ে ঘিঞ্জি ও অপরিকল্পিত এলাকাগুলোর একটি হলেও সেখানে কেন একই ধরনের বুলডোজার অভিযান চালানো হচ্ছে না? তারা জানতে চান, ওই এলাকায় বিজেপি নির্বাচনে জয়ী হয়েছে এবং সেখানে হিন্দু মাড়োয়ারি ও গুজরাটি সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন বলেই কি বুলডোজার সেখানে যাচ্ছে না?
অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটসের প্রতিবেদন
অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটসের (APCR) একটি বিস্তৃত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মে মাসের ৪ থেকে ৭ তারিখের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের অন্তত আটটি জেলায় ব্যাপক সহিং’\সতা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
কোচবিহার, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, কলকাতা মেট্রো এলাকা, মুর্শিদাবাদ ও হাওড়াসহ বিভিন্ন জেলায় সংঘটিত অন্তত ৩৪টি ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ নথিভুক্ত করেছে সংগঠনটি। এই অসহিষ্ণুতা ও সহিং’\সতা’\র মর্মান্তিক পরিণতিতে অন্তত দুজনের প্রাণ’\হানি ঘটেছে। তাদের মধ্যে কোচবিহারের গোসানিমারিতে একটি মসজিদ রক্ষা করতে গিয়ে এক মুসলিম ব্যক্তির মৃ’\ত্যু’\র ঘটনাও রয়েছে।
ধারাবাহিক আ’\ক্রমণে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে অন্তত ৫৪টি সম্পত্তি আ’\ক্রমণ বা ধ্বংসের শিকার হয়েছে। এসব সম্পত্তির মধ্যে বসতবাড়ি, দোকানপাট ও রাজনৈতিক দলের কার্যালয় রয়েছে।
শারীরিকভাবে কিংবা অন্য কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ৫০ জন। উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাতে মুসলিম মালিকানাধীন একটি হোটেল বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমতায় বেছে বেছে ১৫টি বাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। কলকাতার হকার ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের ওপরও হা’\মলা চালানো হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে মুসলিমদের অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার একটি সুপরিকল্পিত রূপরেখারও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। হাওড়া, কলকাতা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় জোরপূর্বক গবাদিপশুর বাজার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মাংসের দোকানগুলোতেও অবাধে হা’\মলা ও ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ উঠেছে।
ধর্মীয় পরিচয় ও মৌলিক অধিকারের ওপর আঘাত শুধু বাড়িঘর বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিসরেও ছড়িয়ে পড়েছে। কোচবিহারের তিনটি মসজিদে হা’\মলা, ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়ে ধর্মীয় স্থাপনায় আ’\ক্রমণ এবং হাওড়ার বীরশিবপুরে এক ইমামকে হেনস্তার ঘটনা গভীর সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও এই বিদ্বেষ থেকে রেহাই পায়নি। হাওড়ার ডোমজুড়ে আজাদ হিন্দ কলেজে মুসলিম ছাত্রীদের হিজাব পরতে বাধা দেওয়ার ঘটনা তারই একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।
এর পাশাপাশি উত্তর ২৪ পরগনার ‘এন পাড়া মসজিদ বাড়ি রোড’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘নেতাজি পল্লী রোড’ রাখা হয়েছে। ‘সিরাজউদ্দৌলা উদ্যান’-এর নাম বদলে করা হয়েছে ‘শিবাজী উদ্যান’। বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, এসব নাম পরিবর্তন একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব মুছে ফেলার প্রচেষ্টারই নামান্তর।
মূলধারার সংবাদমাধ্যমে ঘটনাগুলো তেমন গুরুত্ব না পেলেও স্থানীয় সূত্র ও নাগরিক অধিকার রক্ষায় সক্রিয় সংগঠনগুলোর মতে, এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো সংঘাত নয়। বরং পশ্চিমবঙ্গে তৈরি হওয়া বিস্তৃত ও ভয়াবহ বিদ্বেষমূলক পরিবেশের বাস্তব প্রতিফলন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পর্যবেক্ষণ
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (Human Rights Watch) জানিয়েছে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মুসলিমদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমানভাবে নিপীড়নমূলক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি-শাসিত কয়েকটি রাজ্যে আইনি অনুমোদন ছাড়াই মুসলমানদের বাড়িঘর ও সম্পত্তি ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটি আরও জানায়, একটি হিন্দু উৎসবে বিঘ্ন ঘটানোর অভিযোগে মুসলিম পুরুষদের প্রকাশ্যে বেত্রা’\ঘাত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় আইনগত বিচারপ্রক্রিয়া অনুসরণের পরিবর্তে তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়া পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ভারতের কয়েকটি রাজ্যের কর্তৃপক্ষ সংক্ষিপ্ত ও তাৎক্ষণিক শাস্তি হিসেবে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিং’\সতা চালাচ্ছে। আইনের শাসনকে প্রকাশ্যভাবে উপেক্ষা করে কর্মকর্তারা জনগণকে এমন বার্তা দিচ্ছেন যে, মুসলিমদের প্রতি বৈষম্য করা এবং তাদের ওপর আ’\ক্রমণ চালানো গ্রহণযোগ্য।
সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুজরাটের খেদা জেলায় একটি হিন্দু উৎসব চলাকালে ‘গরবা’ নামের আনুষ্ঠানিক নৃত্যে পাথর ছোড়ার অভিযোগে পুলিশ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করে। পরে বন্দুকের হোলস্টার পরা বেসামরিক পোশাকধারী একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে কয়েকজন মুসলিম পুরুষকে প্রকাশ্যে লাঠি দিয়ে বেত্রা’\ঘাত করতে দেখা যায়।
অন্য কয়েকজন কর্মকর্তা ওই ব্যক্তিদের একটি বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে চেপে ধরে রেখেছিলেন। সরকারপন্থি কয়েকটি টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রশংসিত ভিডিওতে দেখা যায়, উর্দিধারী পুলিশ সদস্যরা দাঁড়িয়ে বেত্রা’\ঘাত দেখছেন। অভিযুক্তদের লাঠি দিয়ে মারার সময় আশপাশে থাকা নারী-পুরুষের একটি দল উল্লাস ও হাততালি দিচ্ছিল।
মধ্যপ্রদেশের মান্দসৌর জেলায় একটি গরবা অনুষ্ঠানে পাথর ছোড়ার অভিযোগে ১৯ জন মুসলিম পুরুষের বিরুদ্ধে হ’\ত্যা’\চেষ্টা ও দাঙ্গার মামলা করে পুলিশ। তাদের মধ্যে সাতজনকে আটক করা হয়। দুই দিন পর কোনো আইনি অনুমোদন ছাড়াই ওই ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজনের বাড়ি ভেঙে দেয় কর্তৃপক্ষ। প্রশাসনের দাবি ছিল, বাড়িগুলো অবৈধভাবে নির্মিত।
মধ্যপ্রদেশের খারগোন জেলা, গুজরাটের আনন্দ ও সবরকান্থা জেলা এবং দিল্লির জাহাঙ্গীরপুরী মহল্লায় সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের পর কর্তৃপক্ষ নির্বিচারে বহু সম্পত্তি ভেঙে দেয়। ধ্বংস করা সম্পত্তিগুলোর অধিকাংশই মুসলমানদের মালিকানাধীন ছিল।
হিন্দু উৎসবের সময় সশস্ত্র হিন্দু পুরুষদের ধর্মীয় শোভাযাত্রা মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর এসব সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছিল। শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা মসজিদের সামনে মুসলিমবিরোধী স্লোগান দিলেও পুলিশ কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ স্থাপনাগুলোকে অবৈধ বলে দাবি করে ধ্বংসযজ্ঞকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে তাদের কার্যক্রম ও প্রকাশ্য বক্তব্য থেকে ধারণা করা হয়, সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের জন্য মুসলমানদের সম্মিলিতভাবে দায়ী করে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এসব অভিযান চালানো হয়েছিল।
মধ্যপ্রদেশের বিজেপিদলীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রকাশ্যে বলেছিলেন, পাথর ছোড়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। খারগোনে কর্তৃপক্ষ অন্তত ১৬টি বাড়ি ও ২৯টি দোকান ভেঙে দেয়।
সেখানকার জেলা কালেক্টর বলেন, অপরাধীদের একে একে খুঁজে বের করা সময়সাপেক্ষ। তাই দাঙ্গাকারীদের ‘শিক্ষা দিতে’ দাঙ্গা সংঘটিত হওয়া পুরো এলাকা পরীক্ষা করে সব অবৈধ স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ক্রমেই এমনভাবে কাজ করছে, যেন তাৎক্ষণিক শাস্তি একটি রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়েছে। ভারত সরকার যদি সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে তৈরি বৈষম্যমূলক আইন, নীতি ও পদক্ষেপগুলো প্রত্যাহারে অবিলম্বে ব্যবস্থা না নেয়, তবে আইনের শাসনের জায়গায় বুলডোজার ও লাঠির রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে।
মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধে জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশিষ্ট মানবাধিকার সংগঠক ও রাষ্ট্রদূত স্টিফেন জে. র্যাপ গত ৪ মে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ভারতে মুসলিমদের ওপর চলমান নিপী’\ড়নে’\র ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন।
তিনি বলেন, ভারতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহিং’\সতা ও বৈষম্যের একটি চলমান এবং ক্রমবর্ধমান প্রবণতা রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা ও স্বাধীন পর্যবেক্ষকেরা দীর্ঘদিন ধরে এসব ঘটনা নথিভুক্ত করছেন। বিশেষ করে ২০১৯ সাল থেকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ও অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। তার মতে, মুসলমানরা ভারতের ভেতরে একটি নিপী’\ড়িত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্টিফেন জে. র্যাপ বলেন, ২০২২ সালের প্রতিবেদনের মতো এবারও আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটিত হওয়ার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে এমন কিছু কর্মকাণ্ডের প্রমাণ মিলেছে, যেগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে।
আসামে বাংলাভাষী মুসলিমদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, বিষয়টি মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বর্ণবৈষম্যের পর্যায়ে পড়তে পারে। কারণ এর মধ্যে একটি জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পদ্ধতিগত নিপী’\ড়ন, আধিপত্যের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এবং সেই কাঠামোর অধীনে সংঘটিত অমানবিক কর্মকাণ্ডের উপাদান রয়েছে।
আসামের সহিং’\সতা’\য় অন্তত ১৭ হাজার মানুষকে তাদের বাসস্থান থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা হয়েছে। দুই হাজার ৪৫০ জনকে বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ বা জোর করে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনাগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে নির্বাসন বা জোরপূর্বক স্থানান্তরের সমতুল্য হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা একাধিক প্রকাশ্য বক্তব্যে বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ এবং হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের বক্তব্য কার্যত সহিংস সংঘাতকে উৎসাহিত করেছে। তার প্রকাশ্য বক্তব্যকে গণ’\হ’\ত্যা’\র ঝুঁকি বাড়ায়—এমন বক্তব্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
আসাম ও উত্তর প্রদেশ—দুই রাজ্যেই পুলিশের হাতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কথিত ‘এনকাউন্টার কিলিং’-এর ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নি’\হত ব্যক্তিদের মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি।
পুলিশ কর্মকর্তাদের আত্মরক্ষার দাবি সাধারণত স্বাধীন তদন্ত ছাড়াই গ্রহণ করা হয়। জবাবদিহির সম্ভাবনাও প্রায় থাকে না। উল্টো, হ’\ত্যা’\য় জড়িত কর্মকর্তাদের প্রশংসা করা এবং উচ্চপদে পদোন্নতি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
আসামে হিমন্ত বিশ্বশর্মার সরকারের প্রথম তিন বছরে এ ধরনের ঘটনায় ৮৩ জনকে হ’\ত্যা করা হয়েছে। উত্তর প্রদেশে যোগী আদিত্যনাথ সরকারের প্রথম সাত বছরে কথিত এনকাউন্টারে ২৬৬ জনের মৃ’\ত্যু হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুসলমানদের লক্ষ্য করে নিপীড়নমূলক ও শাস্তিমূলক পুলিশি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে যে প্রাণঘাতী সহিং’\সতা চালানো হচ্ছে এবং প্রতিকারের অভাবে যা আরও জটিল হয়ে উঠছে, তা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে নিপী’\ড়নে’\র পর্যায়ে পড়তে পারে।
উত্তর প্রদেশ পুলিশ ‘অপারেশন ল্যাংলা’ নামে পরিচিত একটি নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই কৌশলে আইন প্রয়োগের সময় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে হ’\ত্যা না করে পঙ্গু বা বিকলাঙ্গ করে দেওয়া হয়। ঘটনাগুলো ‘হাফ এনকাউন্টার’ নামেও পরিচিত।
শুধু ২০২৪ সালেই এমন ৫৬ জন ভুক্তভোগীর তথ্য গণনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ধরনের ঘটনা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে নির্যা’\তনে’\র পর্যায়ে পড়তে পারে। কারণ রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যক্তিদের ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে গুরুতর শারীরিক যন্ত্রণা ও কষ্ট চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞরা ভারতের মানবাধিকার পরিস্থিতির দিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য বারবার আহ্বান জানিয়েছেন। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ বর্ণবৈষম্য নিরসন কমিটির ‘আর্লি ওয়ার্নিং অ্যান্ড আর্জেন্ট অ্যাকশন’ পদ্ধতি।
২০২০ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে ভারতে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অপব্যবহারের বিষয়ে ৯১টি প্রতিবেদন জমা পড়েছে। কিন্তু এসব প্রতিবেদনের কোনোটি দৃশ্যমান প্রভাব ফেলতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ভারত তার আন্তর্জাতিক চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা করছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র, মানবাধিকার পরিষদ ও বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও নিজেদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে।
বিদ্বেষের ন্যারেটিভ থেকে বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা
মানবাধিকারকর্মীরা সতর্ক করে বলেছেন, ব্যাপক সহিং’\সতা কখনোই সরাসরি যুদ্ধ দিয়ে শুরু হয় না। এর সূচনা হয় বিভিন্ন বিদ্বেষমূলক ন্যারেটিভ, বক্তব্য ও ধারণা তৈরির মাধ্যমে। সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে তৈরি এসব ন্যারেটিভ একপর্যায়ে মানুষকে বিশ্বাস করাতে চায় যে, ওই সম্প্রদায়ের সঙ্গে স্বাভাবিক সহাবস্থান সম্ভব নয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় এমন আইনগত ও প্রশাসনিক কার্যক্রম, যা জনগণের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করে, অধিকারের ক্ষেত্রে পার্থক্য তৈরি করে এবং নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে জনসংখ্যাগত বা নিরাপত্তাজনিত হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে।
পরবর্তী সময়ে এই প্রক্রিয়াই জাতিগত নির্মূল এবং শেষ পর্যন্ত গণ’\হ’\ত্যা’\য় রূপ নিতে পারে। রুয়ান্ডা, যুগোস্লাভিয়া ও মিয়ানমারের অভিজ্ঞতায় এমন ধারাবাহিকতার উদাহরণ দেখা গেছে।
অধিকারকর্মীদের মতে, ভারতে চলমান মুসলিম নির্যা’\তনে’\র বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার সময় এখনই। বিশ্ব সম্প্রদায় দেশটির মুসলিমদের ওপর চলমান নির্যা’\তন বন্ধে কার্যকর ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে রুয়ান্ডা বা মিয়ানমারের মতো সংখ্যালঘু মুসলিম নি’\ধনে’\র মর্মান্তিক দৃশ্য দেখতে হতে পারে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অতীতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যাপক অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। আসাম, উত্তর প্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের লক্ষ্য করে নেওয়া পদক্ষেপগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বলে সতর্ক করছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
তাদের মতে, এগুলো এমন একটি প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পর্যায়, যা নিয়ন্ত্রণহীন থাকলে আরও সুপরিকল্পিত ও ব্যাপক সহিং’\সতা’\য় রূপ নিতে পারে। ভারতে যে বিপর্যয় এখনো এড়ানো সম্ভব, তা যেন ভবিষ্যতে অনিবার্য হয়ে না ওঠে—সেজন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।


