ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত এবং একই সঙ্গে কিংবদন্তিতে পরিণত হওয়া একটি মুহূর্তের সাক্ষী এবার উঠছে নিলামের মঞ্চে। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনা (Diego Maradona)-র বহুল আলোচিত ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের সেই বল নিলামে তুলছে খ্যাতনামা নিলাম প্রতিষ্ঠান হেরিটেজ অকশন (Heritage Auctions)।
১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জেতানোর পথে ম্যারাডোনা শুধু অসাধারণ ফুটবলই উপহার দেননি, সৃষ্টি করেছিলেন এমন এক মুহূর্ত, যা আজও ফুটবল বিশ্বের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে করা তার সেই বিখ্যাত গোলটি নিয়ে পরবর্তীতে তিনি বলেছিলেন, গোলটি হয়েছে “কিছুটা ম্যারাডোনার মাথা দিয়ে, আর কিছুটা ঈশ্বরের হাত দিয়ে।” সেই মন্তব্য থেকেই জন্ম নেয় ফুটবল ইতিহাসের বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ নামটি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিলামে বলটির প্রাথমিক মূল্য ধরা হয়েছে ২৫ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩০ কোটি ৭৬ লাখ টাকার সমান। তবে নিলাম সংশ্লিষ্টদের ধারণা, চূড়ান্ত মূল্য এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। স্মরণীয় ক্রীড়া সামগ্রী সংগ্রাহকদের কাছে বলটি ‘হোলি গ্রেইল’ বা সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সংগ্রহযোগ্য বস্তুগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নিলামকারীদের মতে, বলটির মূল্য ২০২২ সালে নিলামে বিক্রি হওয়া ম্যারাডোনার সেই ম্যাচের জার্সির সমপর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। কাতার বিশ্বকাপ চলাকালে নিলামে ওঠা সেই জার্সির মূল্য দাঁড়িয়েছিল ৯.২ মিলিয়ন ডলার, যা ফুটবল স্মারকের ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত বিক্রয়।
১৯৮৬ বিশ্বকাপের ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচটি শুধু ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের জন্য নয়, আরও একটি অসাধারণ গোলের কারণেও স্মরণীয় হয়ে আছে। একই ম্যাচে ম্যারাডোনা মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে ইংল্যান্ডের পাঁচজন ডিফেন্ডার এবং গোলরক্ষককে পরাস্ত করে যে গোলটি করেছিলেন, সেটি পরবর্তীতে ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ নামে স্বীকৃতি পায়। ফুটবল ইতিহাসে সর্বকালের সেরা গোলগুলোর তালিকায় সেটি এখনও অন্যতম শীর্ষে রয়েছে।
হেরিটেজ অকশনের বিশেষজ্ঞ নিলামকারী মাইক প্রোভেনজাল (Mike Provenzale) রয়টার্সকে বলেন, এই বলটির সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য নির্ধারণের জন্য সরাসরি তুলনা করার মতো কোনো নজির নেই। তার ভাষায়, এটি সত্যিকার অর্থেই এক এবং অদ্বিতীয় সংগ্রহযোগ্য বস্তু। এমনকি এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল স্মারক বলেও দাবি করা যেতে পারে।
বিশ্বকাপ চলাকালে কেন এমন ঐতিহাসিক স্মারকগুলোর প্রতি আগ্রহ বাড়ে, সে ব্যাখ্যাও দিয়েছেন প্রোভেনজাল। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে ক্রীড়া সংগ্রহযোগ্য সামগ্রীর সবচেয়ে বড় বাজার। এই বাজারের সূচনা যেমন সেখান থেকে হয়েছে, তেমনি বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংগ্রাহক গোষ্ঠীর অবস্থানও সেখানে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বাজার আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
তার মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আধুনিক ক্রীড়া সংগ্রহযোগ্য সামগ্রীর বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে ট্রেডিং কার্ডের জনপ্রিয়তা ও মূল্য বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বর্তমানে লিওনেল মেসি (Lionel Messi), ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (Cristiano Ronaldo) এবং কিলিয়ান এমবাপে (Kylian Mbappe)-কে ঘিরে তৈরি বিভিন্ন সংগ্রহযোগ্য কার্ড অবিশ্বাস্য উচ্চমূল্যে বিক্রি হচ্ছে। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তাদের পারফরম্যান্সও এসব সামগ্রীর বাজারমূল্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।
এখন ফুটবলপ্রেমী ও সংগ্রাহকদের নজর সেই বলটির দিকে, যা একদিকে বিতর্কের প্রতীক, অন্যদিকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্তের নীরব সাক্ষী।


