মেটার নীতির বাইরে থেকেও ফেসবুক থেকে আয় করছেন ১৩ এমপি, দাবি ডিসমিসল্যাবের

নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ফেসবুক কনটেন্ট মনিটাইজেশনের সুযোগ না থাকলেও বাংলাদেশের অন্তত ১৩ জন সংসদ সদস্য এখনো সেই সুবিধা পাচ্ছেন বলে দাবি করেছে তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব (Dismislab)। প্রতিষ্ঠানটির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই তালিকায় মন্ত্রিসভার তিনজন সদস্যও রয়েছেন।

ডিসমিসল্যাবের প্রকাশিত অনুসন্ধান অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী জনপ্রতিনিধিদের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে মেটার প্রকাশ্য ‘পার্টনার-পাবলিশার’ তালিকা এবং নেদারল্যান্ডসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘হোয়াট টু ফিক্স’-এর সংরক্ষিত মনিটাইজেশন আর্কাইভ ব্যবহার করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এখনো নিয়মিত বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হচ্ছে। এতে মেটার নিজস্ব মনিটাইজেশন নীতি, যাচাই প্রক্রিয়া এবং সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

ডিসমিসল্যাবের তথ্যমতে, ভেরিফায়েড ১৩টি ফেসবুক পেজ ও প্রোফাইলের মধ্যে সাতজন বিএনপির, পাঁচজন জামায়াতে ইসলামীর এবং একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রয়েছেন। এদের মধ্যে বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের অ্যাকাউন্টও মনিটাইজেশন কর্মসূচিতে সক্রিয় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অন্তত দুটি ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পরও মেটার মনিটাইজেশন কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে লালমনিরহাট-১ আসনের সংসদ সদস্য হাসান রাজীব প্রধানের অ্যাকাউন্ট ৪ ফেব্রুয়ারি এবং চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস কে ফরিদ আহমেদের অ্যাকাউন্ট ১১ ফেব্রুয়ারি, অর্থাৎ ভোটের আগের দিন, এই কর্মসূচিতে যুক্ত হয়।

সবচেয়ে বেশি অনুসারী থাকা অ্যাকাউন্টটি পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. শফিকুল ইসলামের। তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ১৭ লাখের বেশি অনুসারী রয়েছে। পেজ ট্রান্সপারেন্সি তথ্য অনুযায়ী, এটি জামায়াতে ইসলামীর নিয়ন্ত্রণাধীন এবং ২০১৮ সাল থেকেই মনিটাইজেশন কর্মসূচির আওতায় রয়েছে।

এ বিষয়ে শফিকুল ইসলাম ডিসমিসল্যাবকে বলেন, তার আইটি টিম ফেসবুক পেজ পরিচালনা করে এবং তার জানা মতে তিনি ফেসবুক থেকে কোনো আয় করেন না। তবে তার মতে, রাজনীতিবিদদেরও মনিটাইজেশনের সুযোগ থাকা উচিত।

প্রতিবেদনে হাসনাত আব্দুল্লাহ (Hasnat Abdullah)-এর বিষয়টিও উঠে এসেছে। ‘হোয়াট টু ফিক্স’-এর তথ্য অনুযায়ী, তার ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট ৭ ফেব্রুয়ারি মেটার মনিটাইজেশন কর্মসূচিতে যুক্ত হয় এবং ৫ এপ্রিল তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। তবে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও দুটি ফেসবুক পেজে মনিটাইজেশন চালু ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিসমিসল্যাব আরও জানিয়েছে, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের নামে পরিচালিত অন্তত ২২টি আনভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টও মেটার মনিটাইজেশন তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে ১০টি অ্যাকাউন্ট নির্বাচনি প্রচারণার সময় রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনও প্রচার করেছে। কয়েকটি অ্যাকাউন্ট আবার নির্বাচনের পর এই কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছে।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (Transparency International Bangladesh-TIB)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত তৈরি করতে পারে। কারণ, যারা প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মসংক্রান্ত নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারেন, তারাই যদি একই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেন, তাহলে জবাবদিহি ও সুশাসনের প্রশ্ন ওঠে।

প্রতিবেদন প্রকাশের আগে এ বিষয়ে মেটার কাছে ব্যাখ্যা চাইলেও প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে ডিসমিসল্যাব।