মালয়েশিয়াগামী বিমানে রহস্য, বোর্ডিং পাস ও ইমিগ্রেশন শেষে শেষ মুহূর্তে উধাও ৭১ যাত্রী

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মালয়েশিয়াগামী একটি ফ্লাইটকে কেন্দ্র করে রহস্যজনক এক ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে। বোর্ডিং পাস সংগ্রহ এবং ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করার পরও শেষ মুহূর্তে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ওঠেননি ৭১ জন যাত্রী। এর আগে বোর্ডিং গেটে পাঁচজন যাত্রীর ই-ভিসা জাল বলে শনাক্ত হওয়ার পর পুরো ঘটনায় নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

শনিবার (৫ জুলাই) রাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স (Biman Bangladesh Airlines)-এর ঢাকা-মালয়েশিয়া রুটের বিজি-৩৮৬ ফ্লাইটটি শেষ পর্যন্ত ওই ৭৬ জন যাত্রীকে ছাড়াই ঢাকা ত্যাগ করে।

বিমানবন্দর সূত্র জানিয়েছে, বোর্ডিং গেটে পাঁচজন যাত্রীর ই-ভিসা জাল বলে শনাক্ত হওয়ার পর বোর্ডিং লাইনে থাকা আরও অনেক যাত্রী হঠাৎ করেই সরে যান। পরে তাদের অনেকেই ইমিগ্রেশনের প্রস্থান সিল বাতিল করে পুনরায় দেশে প্রবেশ করেন।

সূত্রের দাবি, ওই ৭৬ জন যাত্রীর ভিসা যথাযথভাবে যাচাই ছাড়াই চেক-ইন কাউন্টার থেকে ‘ভেরিফায়েড’ হিসেবে গ্রহণ করে বোর্ডিং পাস ইস্যু করা হয়েছিল। এরপর ইমিগ্রেশনও তাদের বিদেশযাত্রার অনুমতি দেয়। কিন্তু বোর্ডিং গেটে গিয়ে পাঁচজনের ভিসা ও পাসপোর্টের তথ্যে অসঙ্গতি ধরা পড়লে পুরো বিষয়টি সামনে আসে।

বিমানবন্দর-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ধারণা, বিমানে না ওঠা ৭৬ জনই ট্যুরিস্ট ভিসায় মালয়েশিয়া যাচ্ছিলেন। তবে একটি ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে দেশটিতে গিয়ে থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলে প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করা হচ্ছে।

ঘটনার একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, বোর্ডিং চলাকালে কয়েকজন যাত্রীকে আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হয়। পরে তাদের ভিসায় অসঙ্গতির খবর ছড়িয়ে পড়তেই লাইনে থাকা আরও কয়েকজন যাত্রী সরে যান। কিছুক্ষণ পর কয়েকজনকে আনুষ্ঠানিকভাবে অফলোড করা হলে বোর্ডিং গেট এলাকায় উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ফ্লাইটটির ১০ জন যাত্রীকে উড়োজাহাজে ওঠার পর ইমিগ্রেশন বিভাগ আটকে দেয়। পরে আরও পাঁচজনকে বোর্ডিং গেটে ভিসা যাচাইয়ের সময় আটকে দেওয়া হয়। এরপর আরও ৬১ জন যাত্রী বোর্ডিং গেটেই আর উপস্থিত হননি।

বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) বোসরা ইসলাম (Bosra Islam) বলেন, মালয়েশিয়াগামী ওই ফ্লাইটে মোট ২৮৮ জন যাত্রীর টিকিট ছিল। এর মধ্যে ১০ জনকে ইমিগ্রেশন বিভাগ অফলোড করে এবং পাঁচজনকে পাসপোর্ট ও ভিসার অসঙ্গতির কারণে বোর্ডিং গেটেই আটকে দেওয়া হয়। পাশাপাশি ৬১ জন যাত্রী বোর্ডিং পাস নেওয়ার পরও আর গেটে ফেরেননি। শেষ পর্যন্ত ১৯২ জন যাত্রী নিয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৮টার দিকে ফ্লাইটটি ঢাকা ত্যাগ করে।

বিমানবন্দর সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মোট ৭৬ জন যাত্রী ফ্লাইটে ওঠেননি। এর মধ্যে পাঁচজনকে ভিসা সংক্রান্ত অসঙ্গতির কারণে বোর্ডিং গেটে এবং ১০ জনকে ইমিগ্রেশন থেকে অফলোড করা হয়।

বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ (SM Ragib Samad) বলেন, পুরো ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা চক্রকে শনাক্ত করতে কাজ করছেন।

পুলিশের বিশেষ শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার চালুর সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় কিছু যাত্রী ট্যুরিস্ট ভিসার আড়ালে সেখানে কাজের উদ্দেশ্যে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। বিষয়টি ইমিগ্রেশন পুলিশের নজরে আসায় তাদের অফলোড করা হয়।

তিনি আরও জানান, অবৈধভাবে বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে একটি অসাধু চক্র ‘বডি কন্ট্রাক্ট’ পদ্ধতিতে কাগজপত্রে ত্রুটি রেখেই যাত্রীদের ইমিগ্রেশন পার করানোর চেষ্টা করে। গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা, এই চক্রের সঙ্গে বিমানবন্দর ও এয়ারলাইন্সের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।

তবে জাল ভিসার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের বিশেষ শাখার ওই কর্মকর্তা বলেন, তার কাছে জাল ভিসা সংক্রান্ত নির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে সাধারণত যাত্রীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, ভ্রমণের উদ্দেশ্য এবং অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে সন্দেহের ভিত্তিতে যাচাই করা হয়।

বিমানবন্দর সূত্র আরও জানিয়েছে, বিমানে না ওঠা অধিকাংশ যাত্রী একই ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ট্যুরিস্ট ভিসায় দেশটিতে গিয়ে সেখানে থেকে যাওয়ার পরিকল্পনাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য।