এডলফ খানের সাজসজ্জা ও ‘উদ্ভট নাচ’ নিয়ে তুমুল সমালোচনা, প্রশ্নের মুখে আয়োজনও

নিজেকে ‘ফ্যাশন কোরিওগ্রাফার’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া এডলফ খান (Adolf Khan)-এর সাজসজ্জা ও ‘উদ্ভট নাচ’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন ফেসবুক পেজে প্রকাশিত তার নাচের ভিডিও ও রিলসের মন্তব্যের ঘরে জমেছে হাজারো সমালোচনামূলক প্রতিক্রিয়া।

কেউ তার পরিবেশনা নিয়ে কড়া ভাষায় সমালোচনা করছেন, আবার কেউ ট্রল, ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপে মেতে উঠেছেন। নাচের ধরন থেকে শুরু করে পোশাক ও সাজসজ্জা—সবকিছু নিয়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে বিস্তর আলোচনা।

স্টার মাল্টিমিডিয়া (Star Multimedia)-র উদ্যোগে শনিবার, ১১ জুলাই, আয়োজিত ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস প্লাস বিউটি সিজন-৩’ অনুষ্ঠানে অংশ নেন এডলফ খান। ওই অনুষ্ঠানের বিচারক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অভিনেতা মোশাররফ করিম (Mosharraf Karim), শামীম জামান, জয় চৌধুরী এবং চিত্রনায়িকা আঁচল আঁখি।

মঞ্চে নৃত্য পরিবেশনের পর এডলফ খানকে ‘বেস্ট ফ্যাশন কোরিওগ্রাফার’ পুরস্কার দেওয়া হয়। পুরস্কার গ্রহণের সেই ছবিও পরে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করেন তিনি। তবে পুরস্কারের ক্রেস্টে ‘Fashion Choreographer’-এর পরিবর্তে ভুল বানানে ‘feshion Chriographer’ লেখা থাকায় বিষয়টি নতুন করে হাস্যরসের খোরাক হয়ে ওঠে।

অনুষ্ঠানের ভিডিও ও রিলস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই মন্তব্যের ঘরে ভিড় করেন নেটিজেনরা। কেউ এডলফের নাচ ও সাজসজ্জাকে ‘অরুচিকর’ বলে মন্তব্য করেছেন। কেউ তাকে ‘জোকার’ আখ্যা দিয়েছেন, আবার কেউ তার পরিবেশনাকে ‘অসহ্য’ বলেও কটাক্ষ করেছেন।

অনুষ্ঠান-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ভিডিও ও ছবি এডলফ খান নিজেও ফেসবুকে প্রকাশ করেছেন। তার সেসব পোস্টের মন্তব্যের ঘরেও দেখা গেছে ব্যাপক সমালোচনা। নিপা মোনালিসা নামের একজন লিখেছেন, “হাজার হাজার মানুষ গা’\লি দিচ্ছে, সেটাকেই জনপ্রিয়তা ভাবছে এডলফ। ডিজিটাল যুগে এগুলো রুচির দুর্ভিক্ষ ছাড়া কিছু না।”

যাবির আহমেদ লিখেছেন, “ওর বাড়ির লোকজন কেউ ওরে থামায় না কেন?” অন্যদের কেউ কেউ তাকে ‘জোকার’ কিংবা ‘অসহ্য’ বলেও মন্তব্য করেছেন। আলমগীর কবির লিখেছেন, “লজ্জার কোনো ভ্যাকসিন থাকলে ওরে কেউ দিয়ে দেন।”

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব সমালোচনা, ট্রল ও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপকে খুব একটা আমলে নিচ্ছেন না এডলফ খান। রোববার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া একটি পোস্টে তিনি লেখেন, “আর্জেন্টিনার খেলাকেও ছাড়িয়ে নাকি এডলফ খানের নাচের ভিডিও দিয়ে সয়লাব সোশ্যাল মিডিয়া! কয়েকজন ফোন দিয়ে বললো। কী জানি বাবা! আমার তাতে কী? আমি বরং একটু ঘুমাই।”

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন পোস্ট ঘেঁটে দেখা যায়, শুধু এডলফ খানের পরিবেশনাই নয়, অনুষ্ঠানটির আয়োজকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে মোশাররফ করিমের মতো জনপ্রিয় একজন অভিনেতাকে ওই মঞ্চে দেখে হতাশা প্রকাশ করেছেন অনেকেই।

এডলফ খানের মঞ্চ পরিবেশনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী বিজরী বরকতুল্লাহ (Bijori Barkatullah)। ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, “শিল্পের যে কলায় আপনার বিন্দুমাত্র প্রশিক্ষণ নেই, সেটা স্টেজে প্রদর্শন করার যে সাহস আপনি দেখিয়েছেন, তাতে আপনাকে গোবরযুক্ত ঘিলুওয়ালা এবং অপ্রকৃতস্থ বলা উচিত। ভাইরাল হওয়ার এত প্রচেষ্টা? অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপকগণ এবং আপনার প্রতি রইল এক বালতি সমবেদনা!”

তবে পুরো বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবেই দেখছেন অনুষ্ঠানটির আয়োজক স্টার মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার সোহেল রাফসান (Sohel Rafsan)। তিনি চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, “এডলফ খান অনেকদিন ধরে এই অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। স্টেজে যখন সে পারফর্ম করেছে, উপস্থিত সবাই করতালি দিয়েছে। এই অনুষ্ঠান এখন দেশ-বিদেশে প্রচুর ভাইরাল। তবে সব কিছুরই পক্ষ-বিপক্ষ থাকে। সবাই যে ভালো বলবে, এমন নয়। বর্তমান যুগটাই এমন।”

অন্তর্জালে ছড়িয়ে পড়া হাস্যরস ও সমালোচনা নিয়ে এডলফ খানের অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কোনো কাজ ব্যাপকভাবে ভাইরাল হলে শতভাগ ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া আসবে—এমনটা আশা করা ভুল। মঞ্চে সরাসরি পারফরম্যান্স দেখা আর ফেসবুকে ভিডিও দেখার মধ্যে পার্থক্য আছে। আমার এই কাজ কেউ পছন্দ করেছে, আবার কেউ অপছন্দ করেছে। আমার দর্শক যেটা পছন্দ করছে না, সেটা ভবিষ্যতে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করব এবং আরও ভেবেচিন্তে কাজ করব।”

এদিকে শোবিজ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের মতে, ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতায় শিল্প ও সংস্কৃতির মান বিসর্জন দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাদের ভাষ্য, আলোচনায় আসার জন্য বিতর্কিত পরিবেশনাকে সামনে আনা শেষ পর্যন্ত শিল্পাঙ্গনের জন্যই নেতিবাচক বার্তা তৈরি করতে পারে।

তাদের মতে, বিতর্কিত কোনো পরিবেশনা কিংবা প্রশ্নবিদ্ধ ব্যক্তিকে স্বীকৃতি দেওয়া হলে শুধু একটি আয়োজন নয়, পুরো শিল্পাঙ্গনের ভাবমূর্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। একই সঙ্গে অযোগ্য বা বিতর্কিত পরিবেশনাকে পুরস্কৃত করা হলে অ্যাওয়ার্ড আয়োজনের বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

শোবিজের সংশ্লিষ্টদের আরও অভিমত, গুণী শিল্পী ও তারকাদেরও কোন অনুষ্ঠান বা আয়োজনে অতিথি হচ্ছেন, কাকে পুরস্কার দিচ্ছেন কিংবা কোন মঞ্চের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করছেন—সে বিষয়ে আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।

কারণ, পরিচিত শিল্পী ও তারকাদের উপস্থিতি এবং স্বীকৃতি একটি আয়োজনের গ্রহণযোগ্যতা, মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। ফলে কোনো অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগে আয়োজক, আয়োজনের ধরন এবং স্বীকৃতি পাওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে তারকাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তারা।