একটি স্লোগান কিংবা ব’\র্বরো’\চিত হ’\ত্যাকা’\ণ্ড কীভাবে বহুদিনের অবদমিত ক্ষোভকে বিস্ফোরিত করে বিশ্ব কাঁপানো গণঅভ্যুত্থানে রূপ দিতে পারে, তার অসংখ্য দৃষ্টান্ত মানবসভ্যতার ইতিহাসে রয়েছে। বাংলাদেশেও ২০২৪ সালে ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’ স্লোগানটি ঠিক তেমনই এক স্ফুলিঙ্গ হিসেবে আবির্ভূত হয়। পরে দুহাত প্রসারিত করে উদ্যত বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে আবু সাঈদ (Abu Sayed)-এর আত্মদান সেই স্ফুলিঙ্গকে গণবিস্ফোরণের রূপ দেয়। চব্বিশের ১৬ জুলাই একদিনেই আবু সাঈদ, ওয়াসিমসহ ছয় শ’\হীদের আত্মদান কোটাবিরোধী আন্দোলনকে ফ্যাসিবাদী শাসকবিরোধী অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের সূচনায় রূপান্তরিত করে। সেই প্রেক্ষাপটেই আজ দিনটি সরকারিভাবে ‘জু’\লাই শ’\হীদ দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে।
বিশ্ব ইতিহাসেও এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে। ২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর তিউনিসিয়া (Tunisia)-এর সিদি বাউজিদ শহরে ২৬ বছর বয়সী ফল বিক্রেতা তারেক আল-তায়েব মোহামেদ বুয়াজিজির ঠেলাগাড়ি পুলিশ বেআইনি দাবি করে কেড়ে নেয় এবং তাকে অপমান করে। ক্ষোভ ও অপমানে তিনি স্থানীয় পৌরসভা কার্যালয়ের সামনে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে আত্মাহুতি দেন। এই একক ঘটনাই দীর্ঘদিনের বেকারত্ব, দু’\র্নীতি ও বাকস্বাধীনতাহীনতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের জমে থাকা ক্ষোভকে বিস্ফোরিত করে। শুরু হয় স্বৈরশাসক জিনে আল-আবেদিন বেন আলির পতনের আন্দোলন। মাত্র চার সপ্তাহের মধ্যে ২৩ বছর ক্ষমতায় থাকা বেন আলি দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। সেই আন্দোলনই পরে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ‘আরব বসন্ত’-এর জন্ম দেয়।
একইভাবে দক্ষিণ আফ্রিকা (South Africa)-য় ১৯৭৬ সালের ১৬ জুন সোয়েটো শহরে কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীদের ওপর আফ্রিকান্স ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণ মিছিল বের হয়। পুলিশ নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর গু’\লি চালায়। এতে ১২ বছর বয়সী হেক্টর পিটারসনসহ বহু শিক্ষার্থী নি’\হত হন। হেক্টরের রক্তাক্ত মরদেহ কোলে নিয়ে এক যুবকের ছুটে চলার ছবি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। এই নৃশংসতাই কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে বিস্ফোরিত করে এবং বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের গতিপথ চিরতরে বদলে দেয়। একইসঙ্গে নেলসন ম্যান্ডেলার মুক্তির আন্দোলনও নতুন গতি লাভ করে।
বাংলাদেশের ২০২৪ সালের আন্দোলনের গতি-প্রকৃতির সঙ্গে বিশ্বব্যাপী এসব গণআন্দোলনের উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই জনগণের ভেতরে ক্ষোভ, বৈষম্য ও দমন-পীড়নের দীর্ঘ সঞ্চয় ছিল। প্রয়োজন ছিল কেবল একটি স্ফুলিঙ্গের। কোথাও সেটি ছিল বুয়াজিজির আত্মাহুতি, কোথাও একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, আবার বাংলাদেশে তা হয়ে ওঠে শিক্ষার্থীদের আবেগে আঘাত করা বৈষম্যমূলক ‘রাজাকার’ ট্যাগ। সেই ট্যাগিংয়ের প্রতিবাদে দাঁড়ানো সাহসের প্রতীক আবু সাঈদ কিংবা ওয়াসিমদের গু’\লি করে হ’\ত্যা করার ঘটনাই আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপর সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই তাই একটি অবিস্মরণীয় দিনে পরিণত হয়েছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (Begum Rokeya University)-এর সাহসী শিক্ষার্থী আবু সাঈদ অন্যায়ের বিরুদ্ধে জীবনকে তুচ্ছ করে অস্ত্রের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে তারুণ্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তাকে ঘিরে ধরে পুলিশের কয়েকজন সদস্য লাঠিপেটা করলেও তিনি পিছু হটেননি। পরে খুব কাছ থেকে তাকে ছররা গু’\লি করে হ’\ত্যা করা হয়। কিন্তু তার আত্মত্যাগ তাকে এমন এক উচ্চতায় পৌঁছে দেয়, যেখানে মানুষের স্মৃতিতে তিনি অমর হয়ে থাকেন।
১৬ জুলাইয়ের পর দেশজুড়ে আন্দোলনকারীদের মধ্যে সেই সাহস ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে আগ্রাসী রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে রাজপথে অবস্থান নেন। প্রায় চৌদ্দশ ছাত্র-জনতা তপ্ত বুলেটের সামনে বুক পেতে জীবন উৎসর্গ করেন। সেই ধারাবাহিকতার পরিণতিতে ৫ আগস্ট দানবীয় সরকারের পতন ও পলায়নের সাক্ষী হয় দেশ ও বিশ্ব।
আজ ‘জু’\লাই শ’\হীদ দিবস’ উপলক্ষে রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক পালন করা হচ্ছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস (Muhammad Yunus)-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ১৬ জুলাইকে ‘জু’\লাই শ’\হীদ দিবস’ হিসেবে পালনের নির্দেশনা জারি করা হয়। বর্তমানে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকার দিনটি উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। জুলাই বিপ্লবের পক্ষের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনও নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি পালন করছে।
দিনটি উপলক্ষে দেশের সব সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। শ’\হীদদের মাগফিরাত কামনায় দেশের সব মসজিদে বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হবে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়েও শ’\হীদদের আত্মার শান্তি কামনায় বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে।
