ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নাটকীয় জয়ের পর মাঠের খেলোয়াড়সুলভ আচরণ ধরে রাখতে পারেননি আর্জেন্টিনার কয়েকজন ফুটবলার। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করার উল্লাসের মধ্যেই রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন আলবিসেলেস্তেরা।
উদযাপনের সময় সাবেক টটেনহ্যাম হটস্পার মিডফিল্ডার জিওভানি লো সেলসো (Giovani Lo Celso) এবং সাবেক ম্যানচেস্টার সিটি ডিফেন্ডার নিকোলাস ওতামেন্দি (Nicolás Otamendi)-কে গ্যালারি থেকে সমর্থকদের দেওয়া একটি বিতর্কিত ব্যানার হাতে নিয়ে উদযাপন করতে দেখা যায়।
ব্যানারটিতে লেখা ছিল, ‘মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জ আর্জেন্টিনার’।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আবেগঘন জয়ের পর ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর আর্জেন্টিনার মালিকানা দাবিসংবলিত এই ব্যানার প্রদর্শন ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এর জেরে সংশ্লিষ্ট ফুটবলারদের বিরুদ্ধে ফিফা (FIFA) কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আইএফএবি ও ফিফার নিয়ম কী বলছে
ফুটবলের আইন প্রণয়নকারী সংস্থা আইএফএবি (IFAB) এবং ফিফার স্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী, ম্যাচ চলাকালীন কিংবা মাঠের ভেতরে কোনো ধরনের রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত বার্তা, স্লোগান, পতাকা বা প্রতীক প্রদর্শন করা নিষিদ্ধ।
আইএফএবির নিয়মে বলা হয়েছে, খেলোয়াড়দের পোশাক বা সরঞ্জামে রাজনৈতিক, ধর্মীয় কিংবা ব্যক্তিগত স্লোগান, বিবৃতি বা ছবি থাকতে পারবে না। একইভাবে কোনো খেলোয়াড় এমন কোনো অন্তর্বাসও প্রদর্শন করতে পারবেন না, যাতে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বার্তা থাকে।
নিয়মে আরও উল্লেখ রয়েছে, এসব বিধি লঙ্ঘিত হলে সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড় এবং দলকে ফিফা বা প্রতিযোগিতার আয়োজক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হতে পারে।
লো সেলসো এবং ওতামেন্দি—দুজনই দীর্ঘদিন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলেছেন। ফলে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর তাদের এমন উদযাপনকে অনেকেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও উসকানিমূলক আচরণ হিসেবে দেখছেন।
বিতর্কটি মাঠের গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও বড় আকার ধারণ করে, যখন আর্জেন্টিনার ভাইস-প্রেসিডেন্ট ভিক্টোরিয়া ভিয়ারুয়েল (Victoria Villarruel) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এই উদযাপনের প্রতি সমর্থন জানান।
তিনি লেখেন, ‘ফকল্যান্ডস আর্জেন্টিনারই! তারা স্টেডিয়ামে এই ব্যানার নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিল, কিন্তু ভুলে গেছে যে আমরা এগুলো আমাদের রক্তে আর হৃদয়ে বহন করি।’
কী এই ‘লাস মালভিনাস’ বা ফকল্যান্ড বিতর্ক
আর্জেন্টিনার পূর্ব উপকূল থেকে প্রায় ৪৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ (Falkland Islands) ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি হিসেবে পরিচালিত হলেও আর্জেন্টিনা এই দ্বীপকে ‘লাস মালভিনাস’ নামে অভিহিত করে এবং এর সার্বভৌমত্ব দাবি করে।
এই ভূখণ্ড নিয়ে দুই দেশের বিরোধের ইতিহাস ১৯ শতকের নেপোলিয়নীয় যুদ্ধের সময় পর্যন্ত বিস্তৃত। ১৭৭৪ সালে ব্রিটেন প্রথম এই অঞ্চলের মালিকানা দাবি করে এবং ১৮৩২ সালে সেখানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।
বিরোধটি সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী রূপ নেয় ১৯৮২ সালে, যখন আর্জেন্টিনার তৎকালীন সামরিক জান্তা দ্বীপটি দখলের উদ্দেশ্যে অভিযান চালায়। ২ এপ্রিল থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত চলা এই সংঘাত ইতিহাসে ‘ফকল্যান্ড যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। যুদ্ধে আর্জেন্টিনার ৬৪৯ জন এবং ব্রিটেনের ২৫৫ জন সেনাসদস্যসহ তিনজন বেসামরিক ব্যক্তি প্রাণ হারান।
পরবর্তীতে আর্জেন্টাইন বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে।
ইতিহাসের সেই পুরোনো ভূ-রাজনৈতিক বিরোধকে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের উদযাপনের সঙ্গে যুক্ত করায় এখন স্পেনের বিপক্ষে মেগা ফাইনালের আগে আর্জেন্টিনার কয়েকজন ফুটবলারের ওপর ফিফার সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি আলোচনায় উঠে এসেছে।


