গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে আলোচিত রামমূর্তি নির্মাণ উদ্যোগের উদ্যোক্তা হরিদাস চন্দ্র তরণী দাসকে অর্থপাচার মামলায় রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। তদন্তকারী সংস্থা জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে তিনি মামলার তদন্তে সহায়ক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। বিশেষ করে তার ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) হিসাবের মাধ্যমে ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের বিষয়ে পাওয়া তথ্য মানিলন্ডারিং তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেন প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পরিদর্শক (এসআই) হেলাল উদ্দিন।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা অর্থপাচারের অভিযোগে গত ১৩ জুলাই সিআইডি (Criminal Investigation Department)-এর ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের এসআই সাইফুল ইসলাম উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা দায়ের করেন। একই দিন রাত সাড়ে ১২টার দিকে গাইবান্ধা (Gaibandha) জেলার পলাশবাড়ী উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের মধ্য রামচন্দ্রপুর গ্রামের শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির (Shri Shri Radha Gobinda Kali Temple) এলাকা থেকে গোয়েন্দা পুলিশ তাকে গ্রে’\প্তার করে। পরদিন আদালত তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ড শেষে বৃহস্পতিবার তাকে আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের ইন্সপেক্টর কে এম রাকিবুল হুদা।
আবেদনে বলা হয়, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় হরিদাস চন্দ্র তরণী তার ব্যাংক হিসাব ও এমএফএস হিসাবগুলোতে বিভিন্ন ব্যক্তি কী কারণে অর্থ জমা করেছেন এবং সেই অর্থ কার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বা কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে—এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তদন্ত সংস্থা জানায়, এসব তথ্য বর্তমানে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং তদন্ত এখনও চলমান। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে রাখা প্রয়োজন। এছাড়া তিনি জামিন পেলে তদন্ত কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আদালতে হরিদাসের পক্ষে আইনজীবী শ্যামল কুমার রায় জামিনের আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষ এর বিরোধিতা করে।
শুনানির একপর্যায়ে আদালত হরিদাসের কাছে জানতে চান তিনি কী করেন। জবাবে তিনি বলেন, তিনি ব্যবসা করেন। কী ধরনের ব্যবসা—এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, চাল ও ডালের ব্যবসা করেন। ব্যবসার লাইসেন্স আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, লাইসেন্স রয়েছে।
এ সময় হরিদাস আদালতকে বলেন, এলাকায় একটি মন্দির থাকায় সেই কারণেই তাকে গ্রে’\প্তার করা হয়েছে। তবে উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর আলোচিত শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য পর্যালোচনায় তদন্ত সংস্থার দাবি, তিনি একজন সাধারণ ব্যবসায়ী হলেও ব্যবসার আড়ালে দেশি-বিদেশি মুদ্রা পাচার এবং হুন্ডি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, তার নামে থাকা ৯টি ব্যাংক হিসাব ও সংশ্লিষ্ট নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি ব্যবসাবহির্ভূত বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ তার হিসাবে জমা করেছেন।
তদন্ত সংস্থার দাবি, হরিদাস চন্দ্র তরণীসহ অজ্ঞাত দুই থেকে তিন সদস্যের একটি সংঘবদ্ধ চক্র হুন্ডির মাধ্যমে দেশি-বিদেশি মুদ্রা পাচার করত। এই চক্র ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকার অপরাধলব্ধ অর্থ অর্জনের পাশাপাশি সেই অর্থ স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে এর প্রকৃত উৎস, অবস্থান ও মালিকানা গোপন করার চেষ্টা করেছে।
সম্প্রতি পলাশবাড়ী উপজেলায় রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির চত্বরে হিন্দু দেবতা রাম (Rama)-এর একটি বিগ্রহ নির্মাণের কাজ শুরু করে মন্দির কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি ছিল, এটি হবে এশিয়ার সর্ববৃহৎ রাম বিগ্রহ।
তবে এই প্রকল্পের অর্থায়নের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলে ইমাম-ওলামা পরিষদ আন্দোলন শুরু করলে গত ৯ জুন মন্দির কর্তৃপক্ষ বিগ্রহ নির্মাণকাজ স্থগিত ঘোষণা করে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ভারতে অবস্থানের পর হরিদাস ২০২৪ সালে এলাকায় ফিরে আসেন। এরপর তিনি গ্রামের কালী মন্দিরের পুরোনো অবকাঠামো পরিবর্তন করে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেন।
