বিশ্ব ফুটবলের দুই প্রজন্মের দুই তারকা—লিওনেল মেসি ও লামিনে ইয়ামালকে একই ফ্রেমে দেখা সেই ছবিটি আজ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত আলোকচিত্র। তবে অনেকেরই অজানা, এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন স্প্যানিশ ফটোগ্রাফার জোয়ান মনফোর্ট (Joan Monfort)।
২০০৭ সালের ডিসেম্বরে বার্সেলোনা (FC Barcelona)-এর একটি দাতব্য ক্যালেন্ডারের জন্য ছবিটি তোলা হয়েছিল। তখন ২০ বছর বয়সী লিওনেল মেসি ছিলেন ক্লাবটির উদীয়মান তারকা, আর লামিনে ইয়ামাল ছিলেন মাত্র পাঁচ মাসের শিশু। বার্সেলোনা ফাউন্ডেশন ও স্প্যানিশ সংবাদপত্র দিয়ারিও স্পোর্টের উদ্যোগে ইউনিসেফ (UNICEF)-এর জন্য আয়োজিত সেই ফটোশুটেই জন্ম নেয় ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় এক মুহূর্ত।
প্রতি বছরই বার্সেলোনার ফুটবলারদের নিয়ে এমন আয়োজন করা হতো, যেখানে শত শত সাধারণ পরিবার অংশ নেওয়ার সুযোগ পেত। কিন্তু ভাগ্যের অদ্ভুত এক পরিহাসে, ভবিষ্যতের বিশ্বতারকা ইয়ামালকেই সেদিন জুটি করা হয়েছিল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার ও আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী মেসির সঙ্গে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের স্পোর্টস প্ল্যাটফর্ম দ্য অ্যাথলেটিক (The Athletic)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মনফোর্ট বলেন, ছবিটি তোলা মোটেও সহজ ছিল না।
তিনি বলেন, “এটুকু বলতে পারি, এই মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করতে আমাকে রীতিমতো রক্ত পানি করতে হয়েছিল।”
মনফোর্ট জানান, ইয়ামালের মা শিলা এবানার সহযোগিতা ছাড়া এই ছবি তোলা সম্ভব হতো না। তাঁর উপস্থিতির কারণেই শিশুটি স্বাভাবিক ছিল এবং মেসির সঙ্গে একটি স্বতঃস্ফূর্ত, স্নেহময় মুহূর্ত তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল।
সেই দিনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, তাঁদের হাতে ১২ জন ফুটবলারের একটি তালিকা ছিল। সাধারণত খেলোয়াড়রা এসে দ্রুত কাজ শেষ করতে চাইতেন। কিন্তু একটি ভালো ছবি তুলতে সময় দিতে হয়। দুই অপরিচিত মানুষের মধ্যে স্বাভাবিক মুহূর্ত তৈরি করাই কঠিন, সেখানে একজন ২০ বছরের তরুণ এবং অন্যজন কোলের শিশু হলে কাজটি আরও জটিল হয়ে যায়। তবে ইয়ামালের মা পুরো সময়টিতে দারুণ সহযোগিতা করেছিলেন। তাঁর উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে শিশুটি ভয় না পায়। তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল একটি মিষ্টি, স্বাভাবিক ও ভালোবাসাময় মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করা।
ছবিগুলোতে দেখা যায়, একটি ছোট প্লাস্টিকের বাথটাবে থাকা ইয়ামালকে গোসল করাতে সাহায্য করছেন মেসি। আরেকটি ছবিতে তোয়ালে জড়িয়ে ছোট্ট ইয়ামালকে কোলে নিয়ে স্নেহভরে দাঁড়িয়ে আছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
দীর্ঘদিন ছবিটি তেমন আলোচনায় না এলেও ২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ চলাকালে ইয়ামালের বাবা মুনির নাসরাউই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটি প্রকাশ করলে মুহূর্তেই সেটি ভাইরাল হয়ে যায়। এরপর থেকেই এটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম প্রতীকী ছবি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মনফোর্ট বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যখন ছবিটি নতুন করে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে, তখন তাঁর নিজেরও বিশ্বাস হচ্ছিল না। ২০০৭ সালে মেসি তখনও বার্সেলোনায় নিজের অবস্থান শক্ত করার পথে ছিলেন। রোনালদিনহো, স্যামুয়েল ইতো, জাভি, ইনিয়েস্তা, পুয়োল ও অঁরিদের মতো তারকাদের ভিড়ে তিনি ছিলেন একজন উদীয়মান প্রতিভা। আর তখন কে-ই বা জানত, সেই কোলের শিশুটি একদিন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে উঠবে! তাঁর ভাষায়, নিয়তি অনেক সময় অবিশ্বাস্য গল্প লিখে দেয়।
বার্সেলোনা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের মাতারো শহর থেকে ইয়ামালকে কোলে নিয়ে ক্যাম্প ন্যুতে এসেছিলেন তাঁর মা। কষ্ট করে আসা প্রতিটি পরিবারকে ছবির একটি করে কপি উপহার দিতেন মনফোর্ট। সেই ছোট্ট ইয়ামালই ২০১৪ সালে মাত্র সাড়ে ছয় বছর বয়সে লা মাসিয়া (La Masia)-তে যোগ দেন। এরপর ২০২৩ সালের এপ্রিলে মাত্র ১৫ বছর বয়সে লা লিগায় এবং ১৬ বছর বয়সে স্পেন জাতীয় দলে অভিষেক ঘটে তাঁর। ইউরো ২০২৪-এ স্পেনকে শিরোপা জেতানোর পর তিনি এখন চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম বড় তারকা। ক্লাব ফুটবলেও তিনি এখন বার্সেলোনায় মেসির কিংবদন্তি ‘১০ নম্বর’ জার্সি পরছেন।
জোয়ান মনফোর্টের ভাষায়, “এটি আমার জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত ছবি। ইয়ামাল যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে এই ছবির ঐতিহাসিক মূল্য আরও বাড়বে। এমন একটি মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করা লটারি জেতার মতোই বিরল সৌভাগ্য।”
তিনি এই ঘটনার তুলনা করেন ১৯৮৬ সালের এপ্রিলের একটি ছবির সঙ্গে, যেখানে লা মাসিয়ার ১৫ বছর বয়সী বল বয় পেপ গুয়ার্দিওলা করতালির মাধ্যমে তৎকালীন কোচ টেরি ভেনাবলসকে বিদায় জানাচ্ছিলেন। পরবর্তীতে গুয়ার্দিওলাই বার্সেলোনার ইতিহাসের অন্যতম সফল খেলোয়াড় ও কোচে পরিণত হন।
আগামী রবিবার মধ্যরাতে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। আর সেই ম্যাচেই মাঠের লড়াইয়ে প্রথমবার প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা হতে পারে একসময় কোলের শিশুকে স্নেহভরে আগলে রাখা মেসি এবং সেই শিশুই—আজকের লামিনে ইয়ামালের।


