ব্রোঞ্জের লড়াইয়ে আজ মুখোমুখি ফ্রান্স-ইংল্যান্ড, আত্মসম্মান রক্ষার শেষ সুযোগ দুই পরাশক্তির

পরাশক্তিদের ফুটবলে ‘ব্রোঞ্জ মেডেল’ কখনোই স্বপ্নের গন্তব্য নয়। ফিফা বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে প্রতিটি দলই নামে শিরোপা জয়ের লক্ষ্য নিয়ে, সান্ত্বনার পুরস্কারের জন্য নয়। কিন্তু সেমিফাইনালে স্বপ্নভঙ্গের পর বিদায়ের আগে অন্তত একটি জয় নিয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করার তাগিদ থেকেই যায়। সেই বাস্তবতায় আজ বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে ইউরোপের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রান্স (France) ও ইংল্যান্ড (England)।

মিয়ামি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য এই ম্যাচটি কেবল নিয়মরক্ষার লড়াই নয়, বরং দুই দলের আত্মসম্মান রক্ষার শেষ সুযোগ। বাস্তবতা হলো, এমন ম্যাচ খেলতে চায় না কোনো দলই। তবুও টুর্নামেন্টের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে আজ রাত ৩টায় মাঠে নামবে দুই ফুটবল পরাশক্তি।

বিশ্বকাপের অন্যতম ফেবারিট হিসেবে সেমিফাইনালে মাঠে নেমেছিল ফ্রান্স। কিন্তু স্পেনের তরুণ, গতিশীল ও আধুনিক ফুটবলের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি কিলিয়ান এমবাপ্পের দল। ২-০ গোলের ব্যবধানে হেরে বিদায় নিতে হয় ব্লুজদের। পুরো ম্যাচে ফরাসি আক্রমণভাগ ছিল বিস্ময়করভাবে নিষ্প্রভ। স্প্যানিশ রক্ষণভাগের বিপক্ষে তাদের প্রত্যাশিত গোল (এক্সজি) ছিল মাত্র ০.৩১, যা তাদের আক্রমণশক্তির সঙ্গে মোটেও মানানসই নয়। ম্যাচ শেষে দলের অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক কৌশল নিয়ে অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে (Kylian Mbappé) নিজেও অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

অন্যদিকে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে দারুণ সূচনা করেও শেষ পর্যন্ত হতাশ হতে হয়েছে ইংল্যান্ডকে। তরুণ উইঙ্গার অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক কৌশলে চলে যায় থ্রি লায়ন্সরা। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে লিওনেল মে’\সির দুটি দুর্দান্ত অ্যাসিস্ট থেকে এনজো ফার্নান্দেজ ও লাউতারো মার্টিনেজ গোল করে আর্জেন্টিনাকে ২-১ ব্যবধানে জয় এনে দেন। এই পরাজয়ের মাধ্যমে ২১ শতকে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে লিড নিয়েও ফাইনালে উঠতে না পারা একমাত্র দল হিসেবে বিব্রতকর রেকর্ড গড়েছে ইংল্যান্ড। ২০১৮ সালের পর আবারও শেষ চারে থেমে যেতে হলো তাদের।

দলীয় সাফল্যের পাশাপাশি এই ম্যাচটি ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। আসরে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ আট গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে শীর্ষে রয়েছেন এমবাপ্পে। তবে তার পেছনেই রয়েছেন ইংল্যান্ডের দুই তারকা হ্যারি কেইন ও জুড বেলিংহাম, যাদের দুজনেরই গোলসংখ্যা ছয়। আজকের ম্যাচে বড় পারফরম্যান্স দেখিয়ে এমবাপ্পেকে টপকে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে তাদের সামনে। ফলে গোল্ডেন বুটের প্রতিযোগিতাও ম্যাচে আলাদা উত্তেজনা যোগ করবে।

ফরাসি ফুটবলের অন্যতম সফল কোচ দিদিয়ের দেশম (Didier Deschamps)-এর জন্য এটি হতে যাচ্ছে জাতীয় দলের দায়িত্বে শেষ ম্যাচ। ৫৭ বছর বয়সী এই কোচের বিদায়টা ফাইনালের মঞ্চে হওয়ার আশা থাকলেও স্পেনের কাছে হারের পর তার রক্ষণাত্মক কৌশল নিয়ে ফ্রান্সজুড়ে শুরু হয়েছে সমালোচনা। দেশম চাইবেন ১৯৮৬ সালের পর ফ্রান্সকে ইতিহাসের চতুর্থ ব্রোঞ্জ পদক এনে দিয়ে অন্তত একটি পডিয়াম ফিনিশের মাধ্যমে নিজের বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের ইতি টানতে।

অন্যদিকে ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেল (Thomas Tuchel) এখন ব্রিটিশ গণমাধ্যম ও ফুটবল বিশ্লেষকদের কঠোর সমালোচনার মুখে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক কৌশলের কারণে তার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এমনকি ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এফএ) পক্ষ থেকে তার চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও চলছে আলোচনা। তবে আজকের ম্যাচে জয় পেলে ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর এটিই হবে ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় সেরা বিশ্বকাপ সাফল্য। এর আগে ১৯৯০ ও ২০১৮ সালের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে হেরে চতুর্থ স্থানেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল তাদের।

ম্যাচের আগে দুই দলই চোটের ধাক্কায় কিছুটা বিপাকে। ফ্রান্সের রক্ষণভাগের অন্যতম ভরসা উইলিয়াম সালিবা পিঠের পুরোনো চোটের কারণে সেমিফাইনালেই মাঠ ছাড়েন। ফলে এই ম্যাচে তার খেলার সম্ভাবনা খুবই কম। তার পরিবর্তে ম্যাক্সেন্স লাক্রোয়া একাদশে সুযোগ পেতে পারেন।

ইংল্যান্ডও হারিয়েছে ডিফেন্ডার রিস জেমসকে। তার অনুপস্থিতিতে ডিজেড স্পেন্স ও নিকো ও’রাইলির ওপরই রক্ষণ সামলানোর দায়িত্ব পড়তে পারে। তবে ইংল্যান্ডের জন্য স্বস্তির খবর, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচের পর বিতর্কে জড়ালেও জুড বেলিংহামের বিরুদ্ধে কোনো নিষেধাজ্ঞা আসেনি। ফলে শক্তিশালী মধ্যমাঠ নিয়েই মাঠে নামতে পারবেন টুখেল।

একদিকে দেশমের বিদায়ী ম্যাচে সম্মান রক্ষার লড়াই, অন্যদিকে বড় দলের বিপক্ষে নকআউট ব্যর্থতার বৃত্ত ভাঙার চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে মিয়ামির এই ম্যাচটি সান্ত্বনার হলেও উত্তেজনায় কোনো ঘাটতি থাকবে না। শেষ পর্যন্ত ব্রোঞ্জ পদক জিতে টুর্নামেন্ট শেষ করবে কে, সেটিই এখন দেখার অপেক্ষা।