ভারতের অন্যতম ঐতিহাসিক স্থাপনা তাজমহল (Taj Mahal) শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে পরিচিত। সাদা মার্বেলে নির্মিত এই বিশ্বখ্যাত স্থাপনাটি শুধু ভারতের নয়, বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় ঐতিহ্য। তবে প্রায় চার শতক পর আবারও নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে তাজমহল। দাবি করা হচ্ছে, মমতাজ মহলের সমাধি নির্মাণের আগে ওই স্থানে একটি মন্দির ছিল এবং তার প্রমাণ নাকি এখনো তাজমহলের বেসমেন্টে লুকিয়ে রয়েছে।
এই দাবিকে সামনে রেখে উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদের একটি জেলা আদালতে তাজমহলে জরিপ পরিচালনার আবেদন করেন এক ব্যক্তি, যিনি বিজেপির সঙ্গে সম্পৃক্ত। জেলা আদালত আবেদনটি খারিজ করে দিলেও পরে বিষয়টি এলাহাবাদ হাই কোর্ট (Allahabad High Court)-এ গড়ায়। আদালত কেন্দ্রীয় সরকার ও আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (Archaeological Survey of India–ASI)-কে নোটিশ দিয়ে জরিপের বিষয়ে তাদের অবস্থান জানতে চেয়েছে।
তবে ইতিহাসবিদদের মতে, তাজমহল নিয়ে এমন বিতর্ক নতুন নয়। তাদের দাবি, ১৯৬৫ সালের আগে এই স্থাপনাকে ঘিরে এ ধরনের কোনো বিতর্ক ছিল না এবং তাজমহলের নির্মাণ ইতিহাসের প্রয়োজনীয় দলিল ও প্রমাণ দীর্ঘদিন ধরেই সংরক্ষিত রয়েছে।
কী বলছে ইতিহাস?
ইতিহাসবিদদের মতে, ১৬৩১ সালে বুরহানপুরে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের স্ত্রী মমতাজ মহলের মৃত্যু হয়। এরপর তার স্মৃতিকে অমর করে রাখতে আগ্রার যমুনা নদীর তীরে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন শাহজাহান।
ইতিহাসবিদ আব্দুল হামিদ লাহোরি রচিত বাদশাহনামা-তে উল্লেখ রয়েছে, তাজমহলের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে। নির্মাণকাজ ১৬৪৮ সালের মধ্যে শেষ হলেও অলংকরণ ও উদ্যানের কাজ সম্পন্ন হতে আরও প্রায় পাঁচ বছর সময় লাগে।
ইতিহাসবিদ ড. রুচিকা শর্মা (Dr. Ruchika Sharma) জানিয়েছেন, তাজমহলের জন্য নির্বাচিত জায়গাটি ছিল অম্বরের রাজা জয় সিংয়ের মালিকানাধীন। জয় সিং জায়গাটি বিনামূল্যে দিতে চাইলেও শাহজাহান তা গ্রহণ করেননি। পরিবর্তে একই মূল্যের আরেকটি জমি দিয়ে বিনিময়ের ব্যবস্থা করেন, যা সম্পন্ন করতে প্রায় দুই বছর সময় লাগে।
প্রচলিত গল্প ও বাস্তবতা
তাজমহলকে ঘিরে বহু প্রচলিত গল্প রয়েছে, যার অনেকগুলোরই ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।
সবচেয়ে আলোচিত একটি দাবি হলো—তাজমহল নির্মাণ শেষে শাহজাহান নাকি কারিগরদের হাত কেটে দিয়েছিলেন, যাতে তারা আর কখনো এমন স্থাপনা নির্মাণ করতে না পারেন। ড. রুচিকা শর্মার মতে, এই গল্পের ঐতিহাসিক সত্যতা প্রমাণিত হয়নি।
আরেকটি প্রচলিত দাবি হলো, তাজমহল নির্মাণে বিপুল ব্যয়ের কারণে গুজরাটে দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল এবং হিন্দুদের ব্যাপক মৃত্যু হয়েছিল। তবে ড. শর্মার বক্তব্য, ওই সময়ে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তা মোকাবিলায় শাহজাহান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েছিলেন এবং খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হয়েছিল। দুর্ভিক্ষে ধর্মভেদে নয়, সব সম্প্রদায়ের মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
তার মতে, এসব গল্প অনেক ক্ষেত্রেই ধর্মীয় বিভাজন তৈরির উদ্দেশ্যে প্রচার করা হয়েছে।
বিতর্কের সূত্র কোথায়?
তাজমহলকে ঘিরে বর্তমান বিতর্কের অন্যতম উৎস ভারতীয় লেখক পুরুষোত্তম নাগেশ ওক (Purushottam Nagesh Oak)। ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত তার বই The Taj Mahal Was a Rajput Palace-এ তিনি দাবি করেন, তাজমহল আসলে একটি রাজপুত প্রাসাদ ছিল, যা পরে শাহজাহান সমাধিতে রূপান্তর করেন।
পরবর্তীতে Taj Mahal: The True Story বইয়ে তিনি আরও দাবি করেন, এটি মূলত দ্বাদশ শতাব্দীর একটি শিব মন্দির, যার নাম ছিল ‘তেজো মহালয়া’।
তবে ইতিহাসবিদরা এই তত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের মতে, তাজমহলের স্থাপত্যশৈলী, পেন্ডেন্টিভ গম্বুজ, তৈমুরি প্রভাব, পারস্যের ‘হাশত বেহেশত’ নকশা এবং মার্বেল খোদাই—সবই স্পষ্টভাবে মুঘল স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য বহন করে।
ড. রুচিকা শর্মা জানান, পিএন ওক ২০০০ সালে একই দাবি নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে গেলেও আদালত তার আবেদন খারিজ করে দেয়।
কেন বারবার ফিরে আসে এই বিতর্ক?
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাজমহলকে ঘিরে নতুন করে মন্দিরের দাবি বৃহত্তর একটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিতর্কের অংশ।
কিছু গোষ্ঠী দাবি করে, ভারতের বহু ইসলামি স্থাপনা নাকি পূর্বে হিন্দু মন্দির ছিল বা সেগুলো হিন্দু স্থাপনার ওপর নির্মিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের দাবির মাধ্যমে ইতিহাসকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়।
২০১৭ সালে এএসআই এক বিবৃতিতে স্পষ্ট জানায়, তাজমহল কখনো মন্দির ছিল বা সেখানে কোনো মন্দিরের অস্তিত্ব ছিল—এমন কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ড. রুচিকা শর্মা প্রশ্ন তুলেছেন, যখন সুপ্রিম কোর্ট আগেই বিষয়টি খারিজ করেছে এবং এএসআইও তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে, তখন একই দাবি নতুন করে আদালতে উত্থাপনের যৌক্তিকতা কী।
বেসমেন্ট নিয়ে কী বলছেন ইতিহাসবিদ?
সাম্প্রতিক দাবিতে বলা হয়েছে, তাজমহলের বেসমেন্টে থাকা ২২টি কক্ষ খুলে পরীক্ষা করা উচিত।
ড. রুচিকা শর্মার মতে, তাজমহল শুধু মমতাজ মহল ও শাহজাহানের সমাধি নয়; এটি মুঘল পরিবারের একটি সমাধিস্থল। তিনি ব্যাখ্যা করেন, বেসমেন্টের কক্ষগুলো দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রাখা হয়েছে মূলত স্থাপনাটির কাঠামো রক্ষার জন্য। সেগুলো খুলে দিলে জলীয় বাষ্পের প্রভাবে ভিত্তির ক্ষতি হতে পারে।
তার ভাষ্য, ওই কক্ষগুলো খুললেও সেখানে সমাধিস্থদের দেহাবশেষ ছাড়া অন্য কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বা মন্দিরের অবশিষ্টাংশ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
ইতিহাস, রাজনীতি ও মতাদর্শের নানা বিতর্কের মাঝেও তাজমহল আজও বিশ্বের অন্যতম দর্শনীয় স্থাপনা। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো পর্যটক এই স্থাপনা দেখতে ভারতে আসেন। বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে বহু মানুষের কাছেই এটি এখনো ভালোবাসা, স্থাপত্যশিল্প ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের এক অনন্য প্রতীক।


