ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম সফল দর্শন ‘টিকি-টাকা’কে আধুনিক গতি, আগ্রাসী প্রেসিং এবং সরাসরি আক্রমণের সঙ্গে মিলিয়ে নতুন এক রূপ দিয়েছে স্পেন জাতীয় ফুটবল দল (Spain National Football Team)। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে (Luis de la Fuente)-র অধীনে লা রোজা এখন শুধু বলের দখল ধরে রাখার দল নয়, বরং প্রতিপক্ষকে শুরু থেকেই চাপে রেখে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ায় পারদর্শী একটি সুসংগঠিত ইউনিট। তাদের শক্তির জায়গা, ট্যাকটিক্যাল দুর্বলতা এবং আক্রমণের মূল অস্ত্র নিয়ে নিচে বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।
প্রেসিং আর বল পুনরুদ্ধারেই সবচেয়ে বড় শক্তি
স্পেনের বর্তমান সাফল্যের ভিত্তি নিখুঁত প্রেসিং এবং নিচ থেকে ধাপে ধাপে আক্রমণ গড়ে তোলার ক্ষমতা। বল হারানোর পর দ্রুত তা পুনরুদ্ধার করার ক্ষেত্রে দলটি টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে তাদের গড় বল পজেশন সর্বোচ্চ, ৬৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ। তবে শুধু বল নিজেদের দখলে রাখাই নয়, প্রতিপক্ষের কাছ থেকে সরাসরি বল কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও তারা সবচেয়ে কার্যকর দল। তাদের বল রিকভারি রেট ৬৮ দশমিক ১৮ শতাংশ।
টেরিটোরিয়াল ডমিনেন্সেও স্পেন এগিয়ে। তারা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হাই-লাইন ডিফেন্স নিয়ে খেলছে, যেখানে রক্ষণভাগ প্রায় মাঝমাঠ পর্যন্ত উঠে আসে। এর ফলে প্রতিপক্ষের আক্রমণভাগের থার্ডেই সর্বোচ্চ ৪০ বার বল পুনরুদ্ধার করেছে তারা। এতে প্রতিপক্ষের বিল্ড-আপ শুরু হওয়ার আগেই তা ভেঙে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
রক্ষণভাগে আইমেরিক লাপোর্তে (Aymeric Laporte) ও পাউ কুবারসি শুধু ডিফেন্ডার নন; নিচ থেকে আক্রমণ গড়ে তোলার প্রথম কারিগরও তারাই।
কোথায় লুকিয়ে আছে দুর্বলতা?
সবকিছু ঠিকঠাক চললেও স্পেনের পুরো কাঠামো একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে ঘিরেই আবর্তিত হয়—রদ্রি (Rodri)। মাঝমাঠে তিনিই দলের নিয়ন্ত্রক, যাকে ঘিরেই পাসিং, রিদম এবং আক্রমণের গতি তৈরি হয়।
প্রতিপক্ষ যদি রদ্রিকে কার্যকরভাবে ম্যান-মার্ক করে তার পাসিং লেন বন্ধ করে দিতে পারে, তাহলে স্পেনের ছন্দ ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। কারণ পুরো সিস্টেমটিই তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বল বিতরণের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
এছাড়া ফুল-ব্যাকরা নিয়মিত আক্রমণে উঠে যাওয়ায় এবং ডিফেন্স লাইন অনেক ওপরে থাকায় মাঝমাঠে বল হারালে রক্ষণভাগ দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকের মুখে পড়ে। গতিময় উইঙ্গারসমৃদ্ধ দলগুলো এই ফাঁকা জায়গা কাজে লাগাতে পারলে স্পেনকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলতে পারে।
দে লা ফুয়েন্তের কৌশলের বৈশিষ্ট্য
লুইস দে লা ফুয়েন্তে ঐতিহ্যবাহী টিকি-টাকাকে ধরে রেখেও তাতে আধুনিক ফুটবলের গতি ও সরাসরি আক্রমণ যুক্ত করেছেন। তার দল সাধারণত ৪-৩-৩ কিংবা ৪-২-৪ ফর্মেশনে খেলে।
স্পেন বল নিজেদের দখলে রাখতে ভালোবাসে, তবে আগের তুলনায় অনেক বেশি ডিরেক্ট ফুটবলও খেলছে। উইঙ্গাররা নিয়মিত এক-অন-এক পরিস্থিতি তৈরি করে দ্রুত বক্সে প্রবেশ করে কিংবা ক্রস ও শট নেওয়ার চেষ্টা করে। মাঝমাঠে সংখ্যাগত আধিপত্য তৈরি এবং ফুল-ব্যাকদের অনেক ওপরে তুলে খেলার মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে সারাক্ষণ চাপে রাখে তারা।
আক্রমণের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র
স্পেনের আক্রমণভাগে দে লা ফুয়েন্তে নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় ডায়মন্ড ফর্মেশনকে আধুনিকভাবে ব্যবহার করেছেন। পুরো আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু রদ্রি, দানি ওলমো এবং লামিনে ইয়ামাল।
রদ্রি নিচ থেকে বল গ্রহণ করে আক্রমণের দিক ও গতি নির্ধারণ করেন। অন্যদিকে দানি ওলমো প্রতিপক্ষের মিডফিল্ড ও ডিফেন্সের মাঝখানের ফাঁকা জায়গা খুঁজে বের করতে অসাধারণ দক্ষ। পাশাপাশি মিকেল মেরিনোর হঠাৎ বক্সে ঢুকে পড়ার প্রবণতা স্পেনের আক্রমণে বাড়তি বৈচিত্র্য এনে দেয়।
সামনের সারিতে মিকেল ওইয়ারজাবাল অথবা ফেরান তোরেস ফলস নাইন হিসেবে খেলেন। তারা নিয়মিত নিচে নেমে এসে প্রতিপক্ষের সেন্টার-ব্যাকদের অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য করেন। এতে তৈরি হওয়া ফাঁকা জায়গায় লামিনে ইয়ামাল কিংবা দানি ওলমো থ্রু-বল ধরে দ্রুত বক্সে ঢুকে আক্রমণ সম্পন্ন করেন।
সব মিলিয়ে বর্তমান স্পেন একটি সূক্ষ্ম যন্ত্রের মতো সমন্বিত দল, যেখানে প্রতিটি খেলোয়াড় নির্দিষ্ট ভূমিকা পালন করে পুরো কাঠামোকে কার্যকর রাখেন। তাদের প্রেসিং, পজেশন এবং দ্রুত আক্রমণ যেকোনো প্রতিপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এই ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু রদ্রিকে নিষ্ক্রিয় করতে পারলে স্পেনের বিপক্ষে সাফল্যের পথ অনেকটাই উন্মুক্ত হতে পারে।
স্পেনের সম্ভাব্য একাদশ
উনাই সিমন; পেদ্রো পোরো, পাউ কুবারসি, আইমেরিক লাপোর্তে, মার্ক কুকুরেয়া; রদ্রি, ফাবিয়ান রুইজ; লামিনে ইয়ামাল, দানি ওলমো, আলেক্স বায়েনা; মিকেল ওইয়ারজাবাল।


