আরেকটি বিশ্বকাপ শিরোপার খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দল (Argentina National Football Team)। টুর্নামেন্টজুড়ে দলটির প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন লিওনেল মেসি (Lionel Messi)। তার নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা এবং অসাধারণ পারফরম্যান্সে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে। তবে শিরোপা জয়ের শেষ লড়াইয়ে প্রতিপক্ষ ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন স্পেন। ফলে কোচ লিওনেল স্কালোনি (Lionel Scaloni)-র দলের সামনে অপেক্ষা করছে কঠিন এক পরীক্ষা।
ফাইনাল ঘিরে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়—মেসির জাদুর বাক্স থেকে এবার কী বের হবে? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আর্জেন্টিনার শক্তির জায়গা, দুর্বলতা, কৌশল এবং সেরা অস্ত্র নিয়ে বিশ্লেষণ।
আক্রমণভাগই আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি
পুরো টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাদের আক্রমণভাগ। যার নেতৃত্বে রয়েছেন মেসি। অনেক সময় মাঠে ধীরগতিতে চলাফেরা করলেও কয়েকটি মুহূর্তেই ম্যাচের চিত্র বদলে দেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা দেখিয়েছেন তিনি। প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা ভেঙে দিয়ে নিজের জাদুকরি ফুটবলে প্রতিটি ম্যাচেই আলাদা ছাপ রেখেছেন এই মহাতারকা।
বিশেষ করে সেট-পিসে আর্জেন্টিনা দারুণ কার্যকর। দলটির উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গোল এসেছে পেনাল্টি, কর্নার কিংবা ক্রস থেকে। মেসির নিখুঁত ডেলিভারিতে দুই প্রান্ত থেকেই বিপজ্জনকভাবে গোলমুখে বল ভেসে আসে, যা সামলাতে প্রতিপক্ষকে প্রায়ই সমস্যায় পড়তে হয়েছে।
মাঝমাঠেও রয়েছে দারুণ ভারসাম্য। এনজো ফার্নান্দেজ, ম্যাক অ্যালিস্টার এবং রদ্রিগো ডি পল ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা, বলের যোগান দেওয়া এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভাঙতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
এছাড়া ম্যাচের পরিস্থিতি দ্রুত বুঝে কৌশল বদলানোর দক্ষতা রয়েছে স্কালোনির। কঠিন চাপ সামলে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা এবং জয়ের অদম্য ইচ্ছাও আর্জেন্টিনার বড় সম্পদ। ফাইনালে এই লড়াকু মানসিকতা বাড়তি শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
কোথায় দুর্বলতা?
আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তাদের রক্ষণভাগ। হাই-লাইন ডিফেন্সে খেলায় প্রতিপক্ষ দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকে উঠলে ডিফেন্সের পেছনে বড় ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়।
ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ও লিসান্দ্রো মার্টিনেজ বল পুনরুদ্ধারের জন্য প্রায়ই নিজেদের অবস্থান ছেড়ে সামনে উঠে আসেন। এতে রক্ষণে শূন্যতা তৈরি হয়, যা প্রতিপক্ষ কাজে লাগাতে পারে। পাশাপাশি রক্ষণ ও মাঝমাঠের সমন্বয় ভেঙে গেলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
আরেকটি বড় বিষয় হলো মেসির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। আক্রমণের প্রায় সব সৃজনশীলতা তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। ফলে প্রতিপক্ষ যদি তাকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, তাহলে আর্জেন্টিনার আক্রমণও কিছুটা সীমিত হয়ে যেতে পারে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ফাইনালকে ঘিরে প্রত্যাশার বাড়তি চাপ।
দলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র
আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় অস্ত্র নিঃসন্দেহে লিওনেল মেসি। গোল করা, সতীর্থদের দিয়ে গোল করানো, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ এবং নেতৃত্ব—সব ক্ষেত্রেই তার প্রভাব অসাধারণ। উচ্চমানের ফুটবল বুদ্ধিমত্তা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং সতীর্থদের সঙ্গে দুর্দান্ত বোঝাপড়া তাকে প্রতিপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিতে পরিণত করেছে।
তার সঙ্গে হুলিয়ান আলভারেজ এবং লাওতারো মার্টিনেজও আক্রমণভাগে ধারাবাহিকভাবে কার্যকর। মেসির সঙ্গে তাদের বোঝাপড়া আর্জেন্টিনার আক্রমণকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে।
অন্যদিকে গোলপোস্টের নিচে আছেন ‘বাজপাখি’খ্যাত এমিলিয়ানো মার্টিনেজ (Emiliano Martínez)। ম্যাচ যদি টাইব্রেকারে গড়ায়, তাহলে তিনিই হতে পারেন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ভরসা।
স্কালোনির কৌশল
স্কালোনি সাধারণত ৪-৩-৩ কিংবা ৪-৪-২ ফর্মেশনে দল সাজান। ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজন হলে তিনি ফর্মেশন পরিবর্তন করতেও দ্বিধা করেন না।
মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে উইং দিয়ে আক্রমণ গড়ে তোলাই আর্জেন্টিনার প্রধান পরিকল্পনা। ডান দিক থেকে ভেতরে ঢুকে পাসিং এবং সুযোগ তৈরি করার দায়িত্ব পালন করেন মেসি। অন্যদিকে হুলিয়ান আলভারেজ প্রতিপক্ষের রক্ষণে নিরন্তর চাপ সৃষ্টি করেন।
প্রয়োজন হলে দল দ্রুত রক্ষণে নেমে সংগঠিত কাউন্টার অ্যাটাকও পরিচালনা করে। মেসিকে স্বাধীনভাবে খেলার সুযোগ দেওয়া এবং ম্যাচের শেষ দিকে গতি বাড়িয়ে নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়াও স্কালোনির পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পাশাপাশি প্রতিপক্ষের ছন্দ ভেঙে দিয়ে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করার কৌশলও নিয়মিত ব্যবহার করে আর্জেন্টিনা।
ফাইনালে মেসির সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
ফাইনালে স্পেনের রক্ষণভাগের বিপক্ষে কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে মেসির জন্য। পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল হজম করেছে স্পেন। বিশেষ করে লেফট-ব্যাক মার্ক কুকুরেয়া দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন।
তবে স্পেনের একমাত্র গোলটি এসেছিল ডান দিক থেকে আসা একটি ক্রস থেকে। ঠিক এই অঞ্চলেই খেলতে সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন মেসি। সেমিফাইনালেও ডান প্রান্ত থেকেই দুটি অ্যাসিস্ট করেছিলেন তিনি। পুরো টুর্নামেন্টে ১২টি গোলে সরাসরি অবদান রাখা এই মহাতারকা ফাইনালেও একই দিক দিয়ে আক্রমণের নেতৃত্ব দিতে পারেন।
আর্জেন্টিনার সম্ভাব্য একাদশ
এমিলিয়ানো মার্টিনেজ; গনজালো মন্টিয়েল, ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, নিকোলাস তাগলিয়াফিগো; লিসান্দ্রো পেরেদেস, রদ্রিগো ডি পল, এনজো ফার্নান্দেজ, ম্যাক অ্যালিস্টার; লিওনেল মেসি, হুলিয়ান আলভারেজ।


