নিট-ইউজি (NEET-UG) ২০২৬ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হা’\মলার প্রতিবাদে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi)-র সরকারি বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আটক হয়েছিলেন লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi)। মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সন্ধ্যায় কয়েক ঘণ্টা হেফাজতে রাখার পর তাকে মুক্তি দেয় দিল্লি পুলিশ (Delhi Police)। এর আগে বিকেলে অবস্থানস্থল থেকে রাহুলকে চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ।
একই কর্মসূচি থেকে আটক করা হয়েছিল প্রিয়াঙ্কা গান্ধী (Priyanka Gandhi), অখিলেশ যাদব (Akhilesh Yadav)-সহ বিরোধী জোটের আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে। সন্ধ্যার দিকে তাদেরও মুক্তি দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার বিকেলে লোককল্যাণ মার্গে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের সামনে চলা অবস্থান কর্মসূচি থেকে বিরোধী নেতাদের আটক করে পুলিশ। রাহুল গান্ধীকে তুলে নেওয়ার পর তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে শুরুতে স্পষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। ফলে তার অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ধোঁয়াশা এবং উদ্বেগ তৈরি হয়।
কংগ্রেস নেতা পবন খেরা অভিযোগ করেন, পুলিশ ইচ্ছাকৃতভাবে আটকদের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য গোপন করছে। পরে জানা যায়, রাহুল গান্ধীসহ আটক নেতাদের উত্তর দিল্লির মডেল টাউনে অবস্থিত ছত্রসাল স্টেডিয়ামে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে দীর্ঘ সময় পুলিশি হেফাজতে রাখার পর সন্ধ্যার দিকে একে একে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার বিকেলে আকস্মিকভাবে শুরু হওয়া এই অবস্থান কর্মসূচির খবর ছড়িয়ে পড়তেই নিরাপত্তা তৎপরতা বাড়ানো হয়। খবর পাওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যে বিপুলসংখ্যক ফোর্স নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে পৌঁছে যায় দিল্লি পুলিশ। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা বিরোধী নেতাদের কর্মসূচিস্থল ছেড়ে সরে যাওয়ার অনুরোধ জানান।
তবে নেতারা অবস্থান চালিয়ে গেলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে পুলিশ রাহুল গান্ধীকে ঘিরে ধরে এবং জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে নেয়। তাকে সরিয়ে নেওয়ার সময় উপস্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দেয়। বিরোধী পক্ষের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নেতাদের সঙ্গে পুলিশ অপ্রয়োজনীয়ভাবে কঠোর আচরণ করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিয়ে বিজেপির অভিযোগ
এই কর্মসূচি নিয়ে বিজেপির পক্ষ থেকে বলা হয়, বিরোধী নেতাদের আকস্মিক অবস্থানের কারণে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছিল। সরকারি বাসভবনের মতো উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় এ ধরনের জমায়েতকে গুরুতর নিরাপত্তা উদ্বেগ হিসেবে দেখছে দলটি।
তবে বিজেপির এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন কংগ্রেস নেতারা। তাদের দাবি, অবস্থান কর্মসূচিটি ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হা’\মলা এবং নিট-ইউজি পরীক্ষায় কথিত কারচুপির বিচার চাওয়াই ছিল কর্মসূচির উদ্দেশ্য। নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা কিংবা কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরির পরিকল্পনা তাদের ছিল না বলেও দাবি করেন তারা।
আটকের আগেই সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র বার্তা
আটক হওয়ার আগে মঙ্গলবার বিকেল চারটার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে, যা আগে টুইটার নামে পরিচিত ছিল, একটি পোস্ট দেন রাহুল গান্ধী। সেখানে তিনি শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের আচরণ এবং সরকার ও সংসদের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন।
রাহুল লেখেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে চলে এসেছি। গতকাল ছাত্রদের ওপর হওয়া পুলিশি অ’\ত্যাচারের জবাব চাইতে আমরা এখানে এসেছি। এই সরকার কোনো দায় নিতে চায় না এবং সংসদে বিতর্কও চায় না। দেশের যুব সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ ধ্বং’\স করার অপ’\রাধে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত।’
তার বক্তব্যে নিট পরীক্ষাকে ঘিরে তৈরি হওয়া ক্ষোভের পাশাপাশি সরকারের জবাবদিহি নিয়েও সরাসরি প্রশ্ন তোলা হয়। বিশেষ করে সংসদে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা না হওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন গুরুতর পরিস্থিতির পরও সরকার দায় স্বীকার করতে প্রস্তুত নয়।
এরপর বিকেল পৌনে ছয়টার দিকে এক্সে আরেকটি বার্তা দেন রাহুল গান্ধী। সেই পোস্টে তিনি দেশবাসীকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে চলা ধরনায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি লেখেন, ‘ছাত্রদের ওপর হা’\মলা মানে প্রতিটি ভারতীয় পরিবারের ওপর হা’\মলা। প্রধানমন্ত্রী মোদি মনে করেন, তিনি বিনা জবাবদিহিতে পার পেয়ে যাবেন। কিন্তু এবার তা হবে না। আমাদের ছাত্ররা সুবিচার পাক—এ কথা যারা বিশ্বাস করেন, আমি সেই প্রত্যেক দেশপ্রেমিক ভারতীয়কে অনুরোধ করব এই ধরনায় শামিল হতে।’
রাহুলের এই আহ্বানে ছাত্র আন্দোলনকে কেবল শিক্ষার্থীদের বিষয় হিসেবে নয়, বরং দেশের প্রতিটি পরিবারের উদ্বেগ হিসেবে তুলে ধরা হয়। আন্দোলনকারীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে তিনি স্পষ্ট করেন, নিট পরীক্ষা নিয়ে ওঠা অভিযোগের জবাব এবং শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি বলপ্রয়োগের বিচার না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকবে।
‘গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ’ বলছে কংগ্রেস
মুক্তির পর ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (Indian National Congress)-এর নেতাকর্মীরা বিরোধী নেতাদের আটক করার ঘটনাকে ‘গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ’ হিসেবে আখ্যা দেন। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা এবং অন্য রাজনৈতিক নেতাদের এভাবে সরিয়ে নেওয়া গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিপন্থী বলেও অভিযোগ করেন তারা।
কংগ্রেসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই আটকের মধ্য দিয়ে ছাত্র আন্দোলনের প্রতি তাদের সমর্থন থামানো যাবে না। শিক্ষার অধিকার, পরীক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং নিট-ইউজি পরীক্ষায় ওঠা কারচুপির অভিযোগের বিচার দাবিতে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
দলটির নেতাদের ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও সরকার যথাযথ জবাব দিচ্ছে না। উল্টো আন্দোলনরত শিক্ষার্থী এবং তাদের পক্ষে দাঁড়ানো রাজনৈতিক নেতাদের ওপর পুলিশি শক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে।
সংসদ অভিমুখে পদযাত্রায় লা’\ঠি’\পেটার পর নতুন কর্মসূচি
উল্লেখ্য, আগের দিন সোমবার ভারতের সংসদ ভবন অভিমুখে পদযাত্রা করার সময় ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) সমর্থক এবং শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ লা’\ঠি’\পেটা করে। ওই ঘটনায় বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী পুলিশি বলপ্রয়োগের শিকার হন বলে অভিযোগ ওঠে।
সোমবারের সেই ঘটনার প্রতিবাদ এবং নিট-ইউজি পরীক্ষায় কথিত কারচুপির নিরপেক্ষ বিচার দাবিতেই মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন বিরোধী নেতারা। তাদের বক্তব্য ছিল, শিক্ষার্থীদের অভিযোগ শোনা এবং পরীক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
অন্যদিকে, পুলিশের বলপ্রয়োগের প্রতিবাদে মঙ্গলবারও শত শত শিক্ষার্থী ও আন্দোলনের সমর্থক যন্তর মন্তরে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তারা নিট পরীক্ষার অনিয়মের বিচার, শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হা’\মলার জবাবদিহি এবং আটক নেতাদের মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
আন্দোলনকারীরা জানান, পুলিশের বলপ্রয়োগ তাদের আন্দোলন থামাতে পারেনি। বরং এ ধরনের পদক্ষেপ শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সংকল্পকে আরও দৃঢ় করেছে। নিট-ইউজি পরীক্ষাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু সমাধান এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথের কর্মসূচি অব্যাহত রাখবেন বলেও জানান।


