দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস সংকট, রান্নাঘর থেকে শিল্পকারখানা—স্থবিরতার চাপ সর্বত্র

রাজধানী ঢাকা (Dhaka)-সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ অনেক কমে যাওয়ায় একদিকে শিল্পকারখানার উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে ঘর-গৃহস্থালিতে প্রতিদিনের রান্নাবান্না নিয়েও চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। কোনো কোনো এলাকায় দিনের দীর্ঘ সময় গ্যাসের দেখা মিলছে না। আবার কোথাও সামান্য গ্যাস এলেও চাপ এত কম যে চুলা জ্বালিয়ে রান্না করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

এই সংকটের প্রভাব পড়েছে গ্যাসচালিত যানবাহনের ওপরও। রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক চালক প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস নিতে পারছেন না। নিম্নচাপের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে গাড়িতে গ্যাস ভরতে হচ্ছে, তবু ট্যাংক পূর্ণ হচ্ছে না। এতে যানবাহনের মালিক ও চালকদের সময়, অর্থ এবং শ্রম—সব দিক থেকেই ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, দেশে এমনিতেই চাহিদার তুলনায় গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ কম। এর মধ্যে মহেশখালী (Maheshkhali)-র ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে গেছে। ফলে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প গ্রাহকদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

অনেক এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় আগুন জ্বলছে না। শিল্পাঞ্চলের বহু কারখানাও প্রয়োজনীয় গ্যাসচাপ না পাওয়ায় উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সময়মতো পণ্য সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানাগুলো বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে।

এদিকে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং কমিশন বাড়ানোর দাবিতে সিএনজি স্টেশন মালিকরা কর্তৃপক্ষকে আলটিমেটাম দিয়েছেন। দ্রুত তাদের দাবি মেনে নেওয়া না হলে লাগাতার ধ’\র্মঘটের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও জানিয়েছেন তারা। এমন পরিস্থিতিতে সিএনজি স্টেশনগুলো বন্ধ হয়ে গেলে পরিবহন খাতে চলমান দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

চাহিদার তুলনায় ঘাটতি ১১০ কোটি ঘনফুটের বেশি

দেশব্যাপী চলমান গ্যাস সংকটের বিষয়ে জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুটের বেশি। শিল্প, বিদ্যুৎ, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, আবাসিক ব্যবহার এবং যানবাহনের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিনই গ্যাসের প্রয়োজন বাড়ছে।

তবে এই বিপুল চাহিদার বিপরীতে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতিদিনই ১১০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাসের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।

জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা গ্যাসের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে আসে প্রায় ১৭৫ কোটি ঘনফুট। অন্যদিকে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি থেকে পাওয়া যায় প্রায় ৯৫ কোটি ঘনফুট। কিন্তু ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে নতুন করে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। ফলে আগে থেকেই থাকা ঘাটতি আরও প্রকট হয়ে দেশজুড়ে সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (Titas Gas Transmission and Distribution Company Limited) জানিয়েছে, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তিতাসের আওতাধীন এলাকার সব শ্রেণির গ্রাহক গ্যাসের স্বল্পচাপের মুখে থাকবেন। একই কারণে অন্যান্য গ্যাস বিতরণ কোম্পানির আওতাধীন গ্রাহকেরাও সরবরাহ সংকটে পড়েছেন।

তিতাসের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। এই দুটি টার্মিনালের মাধ্যমে দৈনিক সর্বোচ্চ প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে টার্মিনাল দুটি থেকে গড়ে ৯৫ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়।

যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসায় দেশজুড়ে গ্রাহকেরা দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন। তিতাস কর্তৃপক্ষ সরবরাহ কমে যাওয়ার জন্য গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে কারিগরি ত্রুটি দ্রুত সমাধানে কাজ চলছে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই জাতীয় গ্রিডে আগের মতো গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে। তবে ত্রুটি পুরোপুরি সারতে কত সময় লাগবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি।

রান্নার জন্য মধ্যরাত পর্যন্ত অপেক্ষা

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গ্যাসের চাপ না থাকায় ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা রান্নাবান্না নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। দিনের বেলায় তো বটেই, অনেকের বাসাবাড়িতে গভীর রাতেও চুলা জ্বালানোর মতো গ্যাস আসছে না। কোথাও কোথাও ভোর বা মধ্যরাতে সামান্য চাপ পাওয়া গেলে তখনই দুই বেলার রান্না একসঙ্গে করে রাখতে হচ্ছে।

হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতেও দিনের বেলায় বিকল্প উপায়ে রান্নাবান্না করতে হচ্ছে। কেউ বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করছেন, কেউ এলপিজি সিলিন্ডার কিংবা অন্য জ্বালানির ওপর নির্ভর করছেন। এতে ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিল্পাঞ্চলগুলোতেও পর্যাপ্ত গ্যাসচাপ না থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উদ্যোক্তা ও কারখানার মালিকদের অভিযোগ, অনেক প্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। ফলে উৎপাদনের পরিমাণ কমে যাওয়ার পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে ক্রয়াদেশের পণ্য সরবরাহ করাও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে রপ্তানিমুখী শিল্প হু’\মকির মুখে পড়েছে বলেও জানিয়েছেন তারা।

শান্তিনগর বাজার রোড এলাকার বাসিন্দা মমতাজ বেগম জানান, তাদের এলাকায় বেশ কিছুদিন ধরেই তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। প্রতিদিন সকাল সাতটার দিকে নাশতা তৈরির জন্য চুলার কাছে গিয়ে তিনি দেখেন, গ্যাস নেই।

দুপুর তিনটার পর সামান্য গ্যাস এলে তখন দুপুরের রান্না করতে হয়। বিকেল থেকে আবার রাত ১২টা পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। ফলে মধ্যরাতে গিয়ে রাতের রান্না করতে হচ্ছে। নিয়মিত রাত জেগে রান্না করতে গিয়ে তিনি অনেকটাই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন বলে জানান।

মিরপুর-২ এলাকার বাসিন্দা বশিরউদ্দিন আহমেদ আমার দেশকে বলেন, তাদের এলাকায় সকাল থেকে রাত নয়টা কিংবা দশটা পর্যন্ত চুলায় গ্যাস থাকে না। বাধ্য হয়ে ভোরে অথবা গভীর রাতে দুই বেলার রান্না একসঙ্গে করতে হয়।

অনেক সময় সেটিও সম্ভব না হওয়ায় রাইস কুকারে ভাত রান্না করে বৈদ্যুতিক চুলায় কোনো রকমে ডিম ভেজে খাওয়াদাওয়া সারতে হচ্ছে। কিন্তু বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ায় মাসিক ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক চুলা বা রাইস কুকার না থাকা পরিবারগুলোর দুর্ভোগ আরও বেশি।

দ্রুত কমছে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত ও উৎপাদন

বর্তমান গ্যাস সংকটের পেছনে দীর্ঘদিন ধরে নতুন প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উৎপাদনে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়াকে দায়ী করছেন বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

হাইড্রোকার্বন ইউনিটের দেওয়া তথ্যমতে, দেশে মোট গ্যাসের মজুত প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট বা টিসিএফ। এর মধ্যে উত্তোলনযোগ্য মজুতের পরিমাণ ২৮ দশমিক ৬২ টিসিএফ। এখন পর্যন্ত ২৩ দশমিক ১২ টিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে।

চাহিদা ও উত্তোলনের বিপরীতে জাতীয় গ্রিডে পর্যাপ্ত নতুন গ্যাস যোগ না হওয়ায় বিদ্যমান মজুত দ্রুত কমে আসছে। নতুন গ্যাসের সন্ধান মিললেও বিভিন্ন জটিলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই তা প্রত্যাশিত গতিতে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নতুন গ্যাস উত্তোলনের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আগামী ১০ থেকে ১১ বছরের মধ্যে দেশের উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত শেষ হয়ে যেতে পারে।

তবে জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কয়েকটি কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়েছে এবং সীমিত পরিমাণে তা জাতীয় গ্রিডে যোগ হচ্ছে। যদিও এই গ্যাসের তথ্য এখনো সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যানে পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

কর্মকর্তাদের মতে, গত ১৬ বছরে দেশে গ্যাসের মজুত নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কোনো সমীক্ষা পরিচালিত হয়নি। এ কারণে প্রকৃত মজুত, উত্তোলনযোগ্য পরিমাণ এবং সম্ভাব্য স্থায়িত্ব নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি রয়েছে।

পেট্রোবাংলা (Petrobangla)-র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১ ফেব্রুয়ারি দেশের সব গ্যাসক্ষেত্র থেকে এক হাজার ৯১১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছিল। ১৫ ফেব্রুয়ারি সেই উৎপাদন কমে এক হাজার ৮৭০ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়ায়।

মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে দেশে গ্যাস উৎপাদন কমেছে ৪১ মিলিয়ন ঘনফুট। উৎপাদনের এই নিম্নমুখী প্রবণতা বিদ্যমান সংকটকে আরও গভীর করছে।

হাইড্রোকার্বন ইউনিটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুরুতে হবিগঞ্জের বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রের প্রাথমিক মজুত ধরা হয়েছিল আট হাজার ৩৮৩ বিলিয়ন ঘনফুট বা বিসিএফ। এর মধ্যে উত্তোলনযোগ্য মজুত ছিল পাঁচ হাজার ৭৫৫ বিসিএফ।

কিন্তু এরই মধ্যে এই ক্ষেত্র থেকে ছয় হাজার বিসিএফের বেশি গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। উন্নয়ন কার্যক্রমের কারণে বিবিয়ানায় উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন।

বিবিয়ানাসহ ওই অঞ্চলের তিনটি গ্যাসক্ষেত্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন (Chevron)। শেভরন পরিচালিত অন্য দুটি গ্যাসক্ষেত্রের মজুতও বর্তমানে শেষ পর্যায়ের দিকে এগিয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও উৎপাদন কমছে

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানি (Bangladesh Petroleum Exploration and Production Company), সংক্ষেপে বাপেক্স, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানি লিমিটেড এবং সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড পরিচালিত গ্যাসক্ষেত্রগুলোতেও উৎপাদন কমে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, দেশে আবিষ্কৃত ২৯টি গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যে ২০টি ক্ষেত্র থেকে মজুতের বড় অংশ ইতোমধ্যে উত্তোলন করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে যে পরিমাণ গ্যাস অবশিষ্ট রয়েছে, তা খুব দীর্ঘ সময় উত্তোলন করা সম্ভব হবে না।

ফলে দ্রুত নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলোতে কূপ খনন এবং আবিষ্কৃত ক্ষেত্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার এ লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করছে। তবে অনুসন্ধান থেকে উৎপাদন পর্যায়ে যেতে সময় লাগায় এসব উদ্যোগের ফল তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া সম্ভব নয়।

সংকটের মূলে এলএনজি আমদানিনির্ভরতা

বিগত সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার ও উৎপাদনে কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে উচ্চমূল্যের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, দেশের ঘাটতি চাহিদা পূরণে নিজস্ব সার্বভৌম জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনের ব্যবস্থা না করে আমদানির দিকে ঝুঁকে পড়ায় অর্থনীতি ও বাণিজ্য খাত ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

২০১৭ সালের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশকে গ্যাস আমদানি করতে হয়নি। ২০১৮ সাল থেকে চাহিদার ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। গত সাত বছরে জ্বালানি আমদানিতে পেট্রোবাংলা এক লাখ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে। এই বিপুল ব্যয়ের পর প্রতিষ্ঠানটি এখন লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্রসীমায় নতুন কূপ খননের পরামর্শ দিয়ে আসছেন। তাদের অভিযোগ, সেই পরামর্শ যথাযথভাবে অনুসরণ না করে এলএনজি আমদানিতেই বেশি আগ্রহ দেখানো হয়েছে।

বাংলাদেশ ২০১২ সালে মিয়ানমারের কাছ থেকে এবং ২০১৪ সালে ভারতের কাছ থেকে বঙ্গোপসাগরের বিরোধপূর্ণ অংশ বুঝে পায়। কিন্তু ওই সমুদ্রসীমায় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের।

অন্যদিকে মিয়ানমার তাদের সমুদ্র এলাকায় গ্যাসের সন্ধান পেয়েছে। অথচ বাংলাদেশ নিজস্ব সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধান জোরদার না করে এলএনজি আমদানির দিকে বেশি ঝুঁকেছে।

এ ক্ষেত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের অভিযোগ, দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের উদ্যোগ না নিয়ে তিনি আমদানির দিকে ঝুঁকেছিলেন এবং এর মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছেন।

উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানিকে বর্তমান জ্বালানি সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দেশে উৎপাদিত স্বল্পমূল্যের প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প হিসেবে উচ্চমূল্যের এলএনজি আমদানি করতে গিয়ে দেশের জ্বালানি খাত এখন টালমাটাল অবস্থায় পড়েছে।

বর্তমানে পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে প্রয়োজনমতো এলএনজি আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না। আবার অর্থের সংস্থান হলেও বিদ্যমান টার্মিনালের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে অতিরিক্ত এলএনজি খালাস করে তা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে না।

ভুলনীতি ও আমদানিনির্ভরতার খেসারত

দেশের গ্যাস সংকটের জন্য আওয়ামী লীগ সরকারের ভুলনীতি ও আমদানিনির্ভরতাকে দায়ী করে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, দেশে গ্যাস অনুসন্ধান না করে ফ্যা’\সিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার বিদেশ থেকে উচ্চমূল্যে গ্যাস আমদানি করেছে।

তার অভিযোগ, এর মাধ্যমে দেশের বিপুল অর্থ লো’\পাটের পাশাপাশি পুরো জ্বালানি খাতকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে। সেই নীতির খেসারত এখন দেশের সাধারণ মানুষকে দিতে হচ্ছে।

বর্তমান সরকারের উদ্যোগের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই জ্বালানি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। দেশে নতুন গ্যাসকূপ অনুসন্ধান এবং বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উন্নয়নে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

তবে অনুসন্ধান, কূপ খনন, পরীক্ষা এবং উৎপাদন শুরু করার পুরো প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ। ফলে এসব উদ্যোগের কার্যকর ফল পেতে আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে বলে জানান তিনি।

দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপের তাগিদ বিশেষজ্ঞদের

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি একগুচ্ছ পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক এবং জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন।

তিনি বলেন, জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা দ্রুত কমিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদনের দিকে নজর দেওয়ার পাশাপাশি বিদ্যমান সম্পদ ব্যবহারে দক্ষতা বাড়াতে হবে।

এসব পদক্ষেপের ফল পেতে কিছুটা সময় লাগলেও বসে থাকার কোনো সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, জ্বালানি খাতের যেসব জায়গায় দু’\র্নীতি হয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে তা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

অধ্যাপক ইজাজ হোসেনের অভিযোগ, বিগত সরকার দেশে জ্বালানি উৎপাদনের সক্ষমতা না বাড়িয়ে খাতটিকে প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর করেছে। তার ভাষ্য, এই নীতির পেছনে লু’\টপাটের উদ্দেশ্য ছিল। বর্তমান সরকারকে সেই পথ থেকে বেরিয়ে এসে নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধান, উত্তোলন ও দক্ষ ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাময়িকভাবে এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটি সারিয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক করা জরুরি হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, পুরোনো ক্ষেত্রের উন্নয়ন, নতুন কূপ খনন এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে টার্মিনালের একটি কারিগরি ত্রুটিই বারবার দেশের রান্নাঘর, পরিবহন ও শিল্প উৎপাদনকে একসঙ্গে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবে।