সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর-কালীগঞ্জ আংশিক) আসনের সংসদ-সদস্য ও জামায়াতে ইসলামী (Bangladesh Jamaat-e-Islami)-র কেন্দ্রীয় নেতা গাজী নজরুল ইসলাম (Gazi Nazrul Islam)-এর ‘ব্যক্তিগত মুহূর্ত’ সংবলিত ভিডিও ঘিরে চলমান আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে এবার ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আব্দুল কাদের (Abdul Kader)।
ওই পোস্টে ভিডিওটি ঘিরে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন অভিযোগ ও প্রশ্ন সামনে এনেছেন তিনি। একই সঙ্গে ঘটনাটি নিছক ব্যক্তিগত সম্পর্কের পরিসরে সীমাবদ্ধ না থেকে সম্ভাব্য বে-আইনি কর্মকাণ্ডের পর্যায়ে চলে গেছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন। তবে তার পোস্টে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নতুন কোনো বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
বুধবার (২২ জুলাই) দেওয়া পোস্টের শুরুতে আব্দুল কাদের জানান, মানুষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সাধারণত তিনি আগ্রহ দেখান না। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের বিষয়েও সচেতন থাকার চেষ্টা করেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আব্দুল কাদের লেখেন, ‘মানুষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না এবং প্রাইভেসি লঙ্ঘন নিয়ে বেশ সচেতন থাকার চেষ্টা করি। তাই সঙ্গত কারণেই জামাত নেতার কর্মকাণ্ড নিয়ে আমি একেবারে নির্লিপ্ত ছিলাম।’
তবে বিষয়টি ব্যক্তিগত পরিসর ছাড়িয়ে সম্ভাব্য বে-আইনি পর্যায়ে পৌঁছেছে—এমন অভিযোগ সামনে আসার পর তিনি বিভিন্ন সূত্রে খোঁজখবর নিয়েছেন বলে পোস্টে দাবি করেন। এরপর তিনি সংশ্লিষ্ট তরুণীর পরিচয়, সংসদ-সদস্যের সঙ্গে তার যোগাযোগ এবং ঘটনাটির সম্ভাব্য প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
চাকরির সুপারিশ চাইতে গিয়ে সুযোগ নেওয়ার অভিযোগ
পোস্টে আব্দুল কাদের দাবি করেন, সদ্য এসএসসি পাস করা এক তরুণী চাকরির সুপারিশ পাওয়ার আশায় এলাকার সংসদ-সদস্যের কাছে গিয়েছিলেন। সেই তরুণীর অসহায় অবস্থার সুযোগ নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি লেখেন, ‘সবচেয়ে কনসার্নিং বিষয় হচ্ছে, সদ্য এসএসসি পাশ করা একটা মেয়ে চাকরির প্রত্যাশায় এলাকার এমপির কাছে গেছেন সুপারিশের জন্য… কিন্তু এমপি সাহেব মেয়ের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাকে রুমে নিয়ে গেছেন!’
তবে তরুণীটি কখন, কোথায় এবং কী ধরনের চাকরির সুপারিশ চাইতে গিয়েছিলেন—এসব বিষয়ে পোস্টে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। একইভাবে ওই অভিযোগের সমর্থনে কোনো আনুষ্ঠানিক নথি বা তদন্তের তথ্যও প্রকাশ করা হয়নি।
আব্দুল কাদেরের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি কেবল একজন জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত জীবনসংক্রান্ত বিতর্ক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং ক্ষমতার অবস্থান ব্যবহার করে একজন চাকরিপ্রত্যাশী তরুণীর অসহায়তার সুযোগ নেওয়া হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা প্রয়োজন বলে ইঙ্গিত করেন তিনি।
পিএ ও চালকের বরাতে আরও অভিযোগ
আব্দুল কাদের পোস্টে আরও অভিযোগ করেন, সংসদ-সদস্যের ব্যক্তিগত সহকারী ও গাড়িচালক নাকি বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাক্ষী। তাদের বরাত দিয়ে জমি ও বালুমহল দখল এবং এলাকায় স’\ন্ত্রাসী বাহিনী ব্যবহারের অভিযোগও তোলেন তিনি।
তার দাবি, ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সুবাদে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এসব ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন। তবে ওই ব্যক্তিগত সহকারী বা গাড়িচালকের কোনো সরাসরি বক্তব্য পোস্টে সংযুক্ত করা হয়নি। তাদের পরিচয় বা অভিযোগের বিস্তারিত প্রমাণও প্রকাশ্যে তুলে ধরা হয়নি।
এ কারণে জমি দখল, বালুমহল নিয়ন্ত্রণ কিংবা স’\ন্ত্রাসী বাহিনী ব্যবহারের অভিযোগগুলোও এখন পর্যন্ত আব্দুল কাদেরের ফেসবুক পোস্টে উত্থাপিত দাবি হিসেবেই রয়েছে।
ধর্মীয় ভাবমূর্তি নিয়েও সমালোচনা
পোস্টে জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান এবং দলটির নেতাদের ধর্মীয় ও নৈতিক ভাবমূর্তি নিয়েও সমালোচনা করেন আব্দুল কাদের। তার বক্তব্য, জামায়াত নিজেদের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের তুলনায় সৎ, নৈতিক ও চরিত্রবান হিসেবে তুলে ধরে বলেই দলটির কোনো নেতাকে ঘিরে এমন অভিযোগ উঠলে তা বেশি আলোচিত হয়।
তিনি লেখেন, ‘জামাত নেতার এমন অনৈতিক কাজ নিয়ে বেশি মাতামাতি হতো না, যদি না তারা নিজেদেরকে অন্যান্যদের তুলনায় সৎ এবং চরিত্রবান রূপে আলাদা সত্তা হিসেবে প্রচার করতেন।’
তার মতে, যারা ধর্মীয় আদর্শ, সততা ও নৈতিকতার কথা বলে নিজেদের আলাদা রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করেন, তাদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সেই অবস্থানের প্রতিফলন থাকার প্রত্যাশাও স্বাভাবিক। সেই জায়গা থেকেই গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পোস্টের একপর্যায়ে আব্দুল কাদের তীব্র ভাষায় প্রশ্ন তোলেন, ‘আপনি নিজেকে ইসলামের একমাত্র ধারক-বাহক এবং গতানুগতিক কালচারের বাইরে সৎ হিসেবে প্রচার করবেন, আর তলে তলে মানুষের টাকা আত্মসাৎ করবেন, নারীদের নানান কায়দায়-প্রলোভনে ধ’\র্ষণ করবেন, ধরা খেয়ে দ্বিতীয় বিয়ের নাটক সাজাবেন; সেটা কেমন চরিত্র আর হেকমত?’
তার এই বক্তব্যে একাধিক গুরুতর অভিযোগ তোলা হলেও সেগুলোর পক্ষে কোনো আদালতের রায়, তদন্ত প্রতিবেদন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। ফলে এসব বক্তব্যকে আব্দুল কাদেরের ব্যক্তিগত অভিযোগ ও রাজনৈতিক সমালোচনা হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
‘ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের’ অভিযোগ
আব্দুল কাদের আরও দাবি করেন, ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার করে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিলের বিরুদ্ধে তিনি এবং আরও কয়েকজন দীর্ঘদিন ধরেই কথা বলে আসছেন।
তিনি লেখেন, ‘আমরা কিছু মানুষ জামাত শিবিরের এহেন চরিত্র-ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীগত স্বার্থ, অপ’\রাধ কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল নিয়ে অনেক আগে থেকে কথা বলেছি।’
তার ভাষ্য, ধর্মীয় পরিচয় বা ধার্মিকতার ভাবমূর্তি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও ধর্মীয় আবেগকে প্রভাবিত করার চেষ্টা সম্পর্কে তারা আগেও মানুষকে সচেতন করতে চেয়েছেন।
আব্দুল কাদের আরও লেখেন, ‘ধর্মীয় লেবাস বা ধার্মিকতার ভান করে সাধারণ মানুষের সরল বিশ্বাস এবং ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করার বিষয়ে সচেতন করার চেষ্টা করেছি। মানুষের হয়তো ধর্মীয় আবেগজনিত দুর্বলতার কারণে বিশ্বাস করতে কষ্ট হইছে, এখন অবশ্য ধীরে ধীরে বুঝছে। আগামীতে আরও ভালোভাবে বুঝবে।’
পোস্টের শেষাংশে তিনি ‘সৎ লোকের শাসন’ এবং ‘আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন’-এর মতো রাজনৈতিক স্লোগান ব্যবহারকারীদের বিষয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষের সচেতন হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন।
তিনি লেখেন, ‘সৎ লোকের শাসন আর আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করার নামে ধর্মব্যবসায়ীদের ব্যাপারে ধর্মপ্রাণ মানুষ সচেতন হবে, নিকট ভবিষ্যতেই রুখে দাঁড়াবে।’
ব্যক্তিগত ভিডিও থেকে দ্বিতীয় বিয়ের দাবি
উল্লেখ্য, গাজী নজরুল ইসলামের ‘ব্যক্তিগত মুহূর্ত’ সংবলিত একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গন ও অনলাইন পরিসরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
প্রথমদিকে জামায়াতসংশ্লিষ্ট কয়েকজন ভিডিওটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন। তবে পরে ভিডিওতে থাকা তরুণীকে গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়।
গাজী নজরুল ইসলামও নিজের ফেসবুক (Facebook) আইডিতে ভিডিওটি নিয়ে ব্যাখ্যা দেন। একই সঙ্গে তিনি পৃথক লিখিত বিবৃতিও প্রকাশ করেন। সেখানে ভিডিওতে থাকা তরুণীকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেন এই সংসদ-সদস্য।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই তরুণীর সঙ্গে বৈধভাবে তার বিয়ে হয়েছে। তবে বিয়ের সময়, নিবন্ধনপ্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশের পর বিষয়টি ঘিরে নতুন প্রশ্ন দেখা দেয়।
কাবিননামা ও বায়োডাটায় তারিখের অসামঞ্জস্য
গাজী নজরুল ইসলামের দাবিকৃত বিয়ের কাবিননামা এবং তরুণীর বায়োডাটা প্রকাশিত হওয়ার পর বিতর্ক আরও বেড়েছে। কারণ, প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দাবিকৃত বিয়ের পাঁচ দিন পরও ওই তরুণীর বায়োডাটায় বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ লেখা ছিল।
এই তথ্য সামনে আসার পর বিয়েটি প্রকৃতপক্ষে কবে সম্পন্ন হয়েছিল, কাবিননামা কখন প্রস্তুত করা হয়েছে এবং বায়োডাটায় কেন ‘অবিবাহিত’ উল্লেখ ছিল—এসব প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তবে কাবিননামা ও বায়োডাটার তথ্যের মধ্যে দেখা দেওয়া কথিত অসামঞ্জস্যের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফল এখনো প্রকাশিত হয়নি। একইভাবে আব্দুল কাদেরের পোস্টে উত্থাপিত গুরুতর অভিযোগগুলোর বিষয়েও গাজী নজরুল ইসলাম বা জামায়াতে ইসলামীর নতুন কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ফলে পুরো ঘটনাটি এখনো ব্যক্তিগত ভিডিও, দ্বিতীয় বিয়ের দাবি, প্রকাশিত নথির তথ্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্থাপিত অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
