ছুটির রাতে ঝালকাঠি পৌর ভূমি অফিসে কার্যক্রম, অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ

সরকারি ছুটির দিনে সরকারি দপ্তরের নিয়মিত কার্যক্রম বন্ধ থাকার কথা। অথচ গভীর রাত পর্যন্ত ঝালকাঠি পৌর ভূমি অফিস (Jhalakathi Municipal Land Office) খোলা রেখে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত অফিস সময়ের বাইরে সেবাগ্রহীতাদের ডেকে এনে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে ভূমিসংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।

শুক্রবার (৩১ জুলাই) রাত প্রায় ১১টার দিকে ঝালকাঠি পৌর ভূমি অফিসে গিয়ে দেখা যায়, অফিসকক্ষের ভেতরে আলো জ্বলছে। তবে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। কয়েকবার কড়া নাড়ার পর দরজা খুলে দেন পৌর ভূমি অফিসের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত তহশিলদার মো. আবুল বাশার (Md. Abul Bashar)। সে সময় তাকে একাই অফিসকক্ষে বসে সরকারি নথিপত্র নিয়ে কাজ করতে দেখা যায়।

এর আগে একই রাত আনুমানিক ৯টার দিকে অফিসের সামনে দুই ব্যক্তিকে কাগজপত্র হাতে তহশিলদারের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। তবে সেখানে গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি টের পাওয়ার পর তারা দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন। পরে তহশিলদারের অনুমতি নিয়ে তিনজন গণমাধ্যমকর্মী অফিসকক্ষে প্রবেশ করেন। তাদের সঙ্গে তহশিলদারের পুরো কথোপকথন গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা হয়।

এত রাতে অফিসে অবস্থানের কারণ জানতে চাইলে তহশিলদার মো. আবুল বাশার বলেন, ‘আমার কাজ থাকতে পারে, আমি কাজ করছি। এতে আপনাদের সমস্যা কোথায়?’

তিনি দাবি করেন, একাধিক দপ্তরের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, সেটেলমেন্ট অফিসসহ বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়। এ কারণে দিনের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব কাজ শেষ করা তার পক্ষে সম্ভব হয় না।

নির্ধারিত অফিস সময়ের বাইরে একা অফিস খুলে সরকারি নথিপত্র নিয়ে কাজ করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘তাও ঠিক বলেছেন। আপনাদের যদি সমস্যা হয় আর আপনারা যদি বলেন, তাহলে আর রাত জেগে জনগণের সেবায় কাজ করব না।’

তবে ভূমিসংক্রান্ত সেবা নিতে আসা কয়েকজন সেবাগ্রহীতা ভিন্ন অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, দিনের নির্ধারিত সময়ে অনেক কাজ সম্পন্ন না করে সন্ধ্যা কিংবা রাতে অফিসে আসতে বলা হয়। পরে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন ভূমিসংক্রান্ত কাজ করে দেওয়া হয়। রাতের বেলায় ওই অফিসে লোকজনের নিয়মিত আসা-যাওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।

রাতে সেবাগ্রহীতারা অফিসে আসেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তহশিলদার প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে তার কাছে তথ্য-প্রমাণ থাকার কথা জানানো হলে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে লোক আসতেই পারে, যেমন আপনারাও এসেছেন।’

কথোপকথনের একপর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আর সামনে না এগোনোর অনুরোধ জানান তিনি। একই সঙ্গে সেখানে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের চা-নাশতার খরচ হিসেবে নগদ টাকা দেওয়ার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ভূমি অফিসসংলগ্ন বারোচালা (Barochala) এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী জানান, তহশিলদার মো. আবুল বাশারকে প্রায়ই রাত ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত অফিসে অবস্থান করতে দেখা যায়। ওই সময়েও বিভিন্ন ব্যক্তি তার কাছে আসা-যাওয়া করেন। তবে গভীর রাতে সেখানে ঠিক কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়, সে বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মো. আবুল বাশার এর আগে দীর্ঘদিন ঝালকাঠি পৌর ভূমি অফিসে কর্মরত ছিলেন। পরে তিনি কীর্তিপাশা (Kirtipasha) ও পোনাবালিয়া (Ponabalia) ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে পোনাবালিয়া ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ঝালকাঠি পৌর ভূমি অফিসের অতিরিক্ত দায়িত্বও তার হাতে রয়েছে।

এদিকে কামারপট্টি এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, তার বাবার জমির নামজারি করতে তহশিলদার প্রথমে ১০ হাজার টাকা দাবি করেছিলেন। পরে তার কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা নেওয়া হয়। এ ছাড়া তাদের দোকান থেকে দুই হাজার টাকার বেশি মূল্যের মালামাল নেওয়া হলেও সেই মূল্য পরিশোধ করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ওই ব্যক্তি আরও জানান, সরকারি নামজারি ফি ১ হাজার ১৭০ টাকা হওয়ার পরও অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার কারণ জানতে চেয়েছিলেন তিনি। তখন তাকে বলা হয়, ‘তুমি এসব বুঝবে না, অনেক টেবিল পার হয়ে কাজ করাতে হয়।’

জানা গেছে, তহশিলদার মো. আবুল বাশারের বিরুদ্ধে এর আগেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছিল। ২০২৬ সালের ১৬ এপ্রিল ঝালকাঠি সদর উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কাছে দেওয়া এক লিখিত অভিযোগে এক সেবাগ্রহীতা দাবি করেন, নামজারির জন্য তার কাছ থেকে ছয় হাজার টাকা নেওয়া হয়েছিল। অথচ সরকারি ডিসিআরে উল্লেখ করা অর্থের পরিমাণ ছিল মাত্র ১ হাজার ১০০ টাকা।

অভিযোগের বিষয়ে এস এম মেহেদী হাসান (S. M. Mehedi Hasan), ঝালকাঠি সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি), বলেন, বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।

তিনি জানান, দাপ্তরিক প্রয়োজন থাকলে সরকারি ছুটির দিন কিংবা নির্ধারিত অফিস সময়ের বাইরে সরকারি দপ্তরে কাজ করা যেতে পারে। তবে ওই সময়ে কোনো সেবাগ্রহীতাকে সরকারি সেবা দেওয়ার সুযোগ নেই।

এস এম মেহেদী হাসান আরও বলেন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।