চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় খলঅভিনেতা ডন হককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রোববার (৯ আগস্ট) দুপুরে বিমানবন্দর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ডনের গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী তার ছেলের মৃ’ত্যুকে হ’ত্যা দাবি করে জড়িতদের বিচারের আশা প্রকাশ করেছেন।
নীলা চৌধুরী বলেন, ‘সালমান আমার সন্তান। সে আমার বুকের মধ্যে আছে, থাকবে। তাকে হ’ত্যা করা হয়েছে। আর সালমান হ’ত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল এই ডন। শুধু তাই নয়, সালমানের মৃ’ত্যুর পর সে আমাকে নানাভাবে অপমান করেছে এবং আমার ছেলে নামে অনেক মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে। আজ সে গ্রেপ্তার হয়েছে। সব প্রমাণ একদিন হবে।’
গণমাধ্যমকে তিনি আরও বলেন, ‘আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা ও বর্তমান সরকারের কাছে আমার আস্থা আছে। সালমান হ’ত্যার সঙ্গে জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তার করা হোক। আশাকরি আমি আমার সন্তান হ’ত্যার বিচার একদিন পাবো।’
প্রায় তিন দশক পর হত্যা মামলা
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের বাসায় মৃ’ত্যু হয় জনপ্রিয় চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহর। ওই ঘটনায় তার বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী অপমৃ’ত্যুর মামলা করেন।
পরে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ছেলেকে হ’ত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে মামলাটি হ’ত্যা মামলা হিসেবে নেওয়ার আবেদন করেন তিনি। অপমৃ’ত্যু ও হ’ত্যার অভিযোগ একসঙ্গে তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন আদালত।
১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃ’ত্যুকে আত্মহ’ত্যা বলে উল্লেখ করা হয়। ওই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালত প্রতিবেদনটি গ্রহণ করেন। তবে সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে রিভিশন মামলা করেন সালমান শাহর বাবা।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক বাদীপক্ষের রিভিশন মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে মামলাটি হ’ত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন আদালত।
এর পরদিন, ২১ অক্টোবর রাজধানীর রমনা থানায় সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর হ’ত্যা মামলা করেন। মামলায় সালমান শাহর স্ত্রী সামীরা হকসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন—শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুছি, খলনায়ক ডন, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু ও রেজভি আহমেদ ফরহাদ। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকেও আসামি করা হয়েছে।
যেভাবে ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে মামলায়
মামলার অভিযোগে মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তার বোন নীলা চৌধুরী, বোনের স্বামী কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী এবং তাদের ছোট ছেলে শাহরান শাহ নিউ ইস্কাটনের বাসায় সালমান শাহর সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, সালমান ঘুমাচ্ছেন।
কিছুক্ষণ পর প্রডাকশন ম্যানেজার সেলিম ফোন করে সালমানের কিছু হয়েছে বলে জানান। দ্রুত বাসায় ফিরে তারা সালমানকে শয়নকক্ষে নিথর অবস্থায় দেখতে পান। অভিযোগে বলা হয়, তখন কয়েকজন নারী তার হাত-পায়ে তেল মালিশ করছিলেন। পাশের কক্ষে সামীরার আত্মীয় রুবি বসে ছিলেন।
সালমানের মা তাকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য চিৎকার করে অনুরোধ করেন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার গলায় দড়ির দাগ এবং মুখমণ্ডল ও পায়ে নীলচে দাগ দেখা যায় বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল হয়ে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সালমান শাহকে মৃ’ত ঘোষণা করেন।
মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়, ছেলের মৃ’ত্যুর আগে থেকেই এটিকে হ’ত্যা বলে সন্দেহ করেছিলেন সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। এ কারণে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই তিনি চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবেদন করেন। সেখানে রমনা থানার অপমৃ’ত্যু মামলাটি দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় হ’ত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণ এবং সিআইডির মাধ্যমে তদন্তের আবেদন জানান।
সালমানের বাবার মৃ’ত্যুর পর আলমগীর তার বোনের পক্ষ থেকে মামলাটি পরিচালনা করছেন। মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে কেউ মৃ’ত্যুবরণ করে থাকলে প্রমাণ সাপেক্ষে তারা মামলার দায় থেকে অব্যাহতি পাবেন।
দেহাবশেষ উত্তোলনের অনুমতিও হয়েছিল
সালমান শাহর মৃ’ত্যুর প্রায় তিন দশক পর হ’ত্যা মামলা হিসেবে তদন্ত শুরু হওয়ার পর এ মামলায় ডনের গ্রেপ্তারকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে গত ২০ মে হ’ত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটনের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে প্রখ্যাত এই চিত্রনায়কের মৃতদেহ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। পরে ২৪ মে সালমান শাহর মরদেহ উত্তোলনপূর্বক সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার অনুমতি দেওয়া হয়।
এদিকে বাদীপক্ষ মরদেহ উত্তোলনের আদেশ বাতিল চেয়ে আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত আবেদনটি নথিভুক্ত করেন।
পরবর্তী সময়ে চলতি বছরের ২২ জুন দেহাবশেষ উত্তোলনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহাকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ-সংক্রান্ত আদেশের অনুলিপি আদালতে দাখিল করা হলে তা নথিভুক্ত করা হয়।
এদিকে মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৩০ আগস্ট দিন ধার্য রয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত সালমান শাহর মৃ’ত্যু রহস্যের তদন্তে ডন হকের গ্রেপ্তারের পর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্টদের।
