১৯৯১ থেকে ২০২৬—দীর্ঘ ৩৫ বছর পর দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আজ বৃহস্পতিবার সরাসরি ভোটাভুটি দেখবেন দেশের মানুষ। বাংলাদেশে সংসদীয় ব্যবস্থা ফিরে আসার পর রাষ্ট্রপতি পদে সর্বশেষ ভোট হয়েছিল ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর। সেই ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয়বারের মতো প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন হচ্ছে আজ। ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন যারা দেখেননি, তাদের জন্য জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদকক্ষে এই ভোটাভুটি প্রত্যক্ষ করা হবে সম্পূর্ণ নতুন এক অভিজ্ঞতা।
৩৫ বছর পর অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনকে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন উপলক্ষে গতকাল বুধবার সংসদ ভবনে সরকারি দলের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় তিনি বলেন, ‘আজ ঐতিহাসিক একটি দিন। অনেক মূল্য দিয়ে আমরা আজ এ জায়গায় এসেছি।’ এ জন্য তিনি আল্লাহর কাছে শুকরিয়াও আদায় করেন।
বিএনপির সংসদীয় দলের সভা শেষে সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘দেশের মানুষ আবার প্রত্যক্ষ করবে কীভাবে ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। একটা ইতিহাসের মাহেন্দ্রক্ষণ তৈরি হবে, ইতিহাসের গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা শুরু হবে।’
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ‘নির্বাচনি কর্তা’ ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনও গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনটিকে ঐতিহাসিক হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়ায় এটি একটি ঐতিহাসিক নির্বাচন। সাবেক রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ এবং নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।’
আজকের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে অবশ্য বড় কোনো অনিশ্চয়তা নেই। কারণ এ নির্বাচনে ভোটার কেবল সংসদ সদস্যরা। সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করা বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন। একইসঙ্গে ৩৫ বছর পর দেশ পেতে যাচ্ছে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত একজন রাষ্ট্রপতি।
মির্জা ফখরুলের প্রতিদ্বন্দ্বী সংসদের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য মনোনীত লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। বিভক্তি ভোটের এই নির্বাচনে দুই প্রার্থীর কে কত ভোট পাবেন, সেটিও মোটামুটি সবারই জানা। ফলে বাকি আয়োজন মূলত আনুষ্ঠানিকতার পর্যায়েই থাকছে।
৫০টি সংরক্ষিত আসনসহ বর্তমান সংসদের সদস্য সংখ্যা ৩৪৯। তবে একটি আসনের গেজেট এখনো প্রকাশ হয়নি। এ কারণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ব্যালটও থাকছে ৩৪৯টি। ভোটের জন্য রাখা হবে তিনটি ব্যালট বাক্স। তবে মালয়েশিয়ায় চিকিৎসাধীন বিএনপি দলীয় এমপি মির্জা আব্বাস ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য জানা যায়নি।
সংসদকক্ষে আজ দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। ভোট শেষে সেখানেই ফলাফল ঘোষণা করবেন নির্বাচনের ‘নির্বাচনি কর্তা’ ও সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন। ফল ঘোষণার পর আজই গেজেট প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এরপর আগামীকাল শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ নেবেন নতুন রাষ্ট্রপতি।
১৯৯১ সালের পর দ্বিতীয়বার প্রত্যক্ষ ভোট
১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী ছিলেন আবদুর রহমান বিশ্বাস। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী, যিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন।
সেই নির্বাচনে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। আর বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। এরপর বিগত সাতবারই ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন।
ফলে সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন হতে যাচ্ছে আজ। দুটি দৃষ্টান্তই বিএনপি সরকারের আমলে।
চলতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিএনপির আসন ২১০টি। জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন পেয়ে বিরোধী দলে বসেছে। দলটির নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন। আনুপাতিক হারে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনেও বিএনপি ও মিত্রদের সদস্য বিরোধীদলের চেয়ে বেশি। ফলে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার হিসাবটি খুবই সরল।
আজ ভোট গণনা থেকে ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত সরাসরি সম্প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও সংসদ টেলিভিশন। গণনা শেষ হওয়ার পর সংসদকক্ষেই ফলাফল ঘোষণা করবেন সিইসি।
রাষ্ট্রপতি পদে আজ ভোট দেবেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানসহ সংসদ সদস্যরা। বিএনপির রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও ভোট দিতে পারবেন, কারণ তিনিও সংসদ সদস্য।
অন্যদিকে অলি আহমদ সংসদ সদস্য না হওয়ায় ভোট দিতে পারবেন না। আর মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়ে যাবে।
‘দল যে সম্মান ও দায়িত্ব দিয়েছে, জীবন দিয়ে হলেও তা রক্ষা করবো’
আজকের ভোটের আগে গতকাল বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় এমপি হিসেবে বিদায়ী বক্তব্য দেন রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বক্তব্য দেওয়ার সময় বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। নেতা-কর্মীদের কাছে দোয়া চাওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
সভায় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি স্বাগত বক্তব্য দেন। তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংসদ সদস্যদের বিস্তারিত ধারণা দেন এবং মির্জা ফখরুল ইসলামের পক্ষে ভোট চান।
এরপর বক্তব্য দিতে দাঁড়ান বিএনপির সদ্য বিদায়ী মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বক্তব্যের শুরুতেই আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এ সময় তিনি বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করেন এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। একইসঙ্গে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘ দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, দায়িত্ব পালনকালে তার কোনো ভুল-ভ্রান্তি হয়ে থাকলে কিংবা অজান্তে কারও মনে আঘাত দিয়ে থাকলে তিনি ক্ষমাপ্রার্থী।
দল তাকে যে সম্মান ও দায়িত্ব দিয়েছে, জীবন দিয়ে হলেও সেই সম্মান রক্ষা করবেন বলে জানান তিনি। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করবেন না বলেও স্পষ্ট করেন। বঙ্গভবনে যাওয়ার পর সহকর্মীদের মিস করবেন উল্লেখ করে সবার কাছে দোয়া চান মির্জা ফখরুল।
সভায় অংশ নেওয়া একাধিক সংসদ সদস্য জানান, কয়েক মিনিটের বক্তব্যে অন্তত চার-পাঁচবার কেঁদেছিলেন মির্জা ফখরুল। এতে সভায় আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। প্রধানমন্ত্রীও এ সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
‘দীর্ঘদিন পর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ায় ঐতিহাসিক নির্বাচন’
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে গতকাল আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের নিজ দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সিইসি ও ‘নির্বাচনি কর্তা’ এ এম এম নাসির উদ্দিন নির্বাচন আয়োজনের প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ১৯৯১ সালের পর আবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এখানে প্রাতিষ্ঠানিক কিছু ঘাটতি রয়েছে, কারণ দীর্ঘ ৩৫ বছর পর এই নির্বাচন হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন কিংবা সংসদ সচিবালয়ও দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরনের নির্বাচন আয়োজনের সঙ্গে অভ্যস্ত নয়।
নাসির উদ্দিন বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা তাদের সীমিত। তারপরও সম্ভাব্য সব দিক বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি নেই এবং পুরো প্রক্রিয়ায়ও যাতে কোনো ঘাটতি না থাকে, সে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। সব অংশীজনের সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সিইসি বলেন, নির্বাচন কমিশন একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজন করতে আত্মবিশ্বাসী।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজন করতে নির্বাচন কমিশনের বড় ধরনের অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে না বলেও জানান নাসির উদ্দিন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যালট ছাপানো, কাগজপত্র ও স্টেশনারিসহ কিছু আনুষঙ্গিক ব্যয় হবে। সংসদ ভবনে বৈঠক আয়োজনের ব্যয় সংসদ সচিবালয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে হতে পারে।
সরাসরি সম্প্রচার হবে ভোট ও গণনা
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটগ্রহণ ও গণনার পদ্ধতি তুলে ধরে সিইসি জানান, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও বিরোধীদলীয় নেতার ভোট দেওয়ার দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ভোট গণনার সময়ও এই সরাসরি সম্প্রচার চালু থাকবে।
তবে ফলাফল ঘোষণার সময় কোন সংসদ সদস্য কোন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তা আলাদাভাবে প্রকাশ করা হবে না। ব্যালটের ওপর ভোটারের নাম ও প্রার্থীর নাম থাকবে।
সিইসি আরও জানান, ভোটগ্রহণের সময় সংসদ অধিবেশন কক্ষে কোনো প্রচার চালানো যাবে না। তবে সংসদ ভবনের বাইরে প্রচারণার বিষয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনসংক্রান্ত আইনে প্রচার-প্রচারণা নিয়ে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন—সেই কারণে আজকের দিনটি শুধু একটি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা নয়, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও আলাদা একটি অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। ভোটের ফলাফল আগে থেকেই অনেকটা স্পষ্ট হলেও সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এই আয়োজনই দীর্ঘ বিরতির পর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সাক্ষী হয়ে থাকছে।
