লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার সীমান্তঘেঁষা গ্রামীণ সড়ক ধরে চলার সময় রাস্তার পাশের বড় বড় গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটিতে চোখে পড়ে একটি অদ্ভুত দৃশ্য। স্পষ্ট অক্ষরে রঙ দিয়ে লেখা—‘মা’\দককে না বলুন—এমপি বাবুল’। কিন্তু দেয়াল ও গাছের গায়ে লেখা এই আহ্বানের সঙ্গে সীমান্ত এলাকার বাস্তবতার যেন বিস্তর ফারাক।
গত ১৪ এপ্রিল র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন লালমনিরহাট-২ (আদিতমারী-কালীগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য রোকন উদ্দিন বাবুল (Rokon Uddin Babul)-এর ভাতিজা ইলিয়াছ হোসেন ওরফে লিটন। তাঁর নিজ বাড়ির গোয়ালঘর থেকে ভারত থেকে আসা কোডিনযুক্ত নিষিদ্ধ সিরাপ ‘এসকাফ’-এর একটি চালান উদ্ধার করা হয়।
এ বিষয়ে এমপি বাবুল ১৯ আগস্ট আমার দেশকে টেলিফোনে বলেন, ‘প্রতিপক্ষরা ষড়যন্ত্র করে আমার ভাতিজাকে মা’\দকে ফাঁসিয়েছিল। পরে র্যাব বিষয়টি জানতে পেরে আর বাড়াবাড়ি করেনি। একটি বিশেষ মহল আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। আপনারা চাইলে সরেজমিন বিষয়টি যাচাই করে দেখতে পারেন।’
লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কুমিল্লা—ভারত সীমান্তঘেঁষা এই চার জেলা ঘুরে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও সীমান্তপথে মা’\দকের কারবার কমেনি। বরং বদলেছে নিয়ন্ত্রণের হাত। একসময় যেসব কারবারি আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের ছত্রছায়ায় ব্যবসা চালাতেন, তাঁদের অনেকে এখন নতুন ক্ষমতাবলয়ের প্রভাবশালীদের আশ্রয়ে সক্রিয়।
সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে উল্টো পুলিশের ওপর নজরদারি, রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার এবং নারী ও শিশুকে বাহক হিসেবে কাজে লাগানোর মতো কৌশলে সীমান্ত পেরিয়ে মা’\দক ঢোকানোর প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে উঠছে। পাশাপাশি হুন্ডি ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এই কারবারের অর্থ লেনদেনও প্রায় নির্বিঘ্নে চলছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
গত ১২ থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত টানা কয়েকদিন সীমান্তের প্রায় ১৫টি পয়েন্ট অনুসন্ধান করেন আমার দেশের প্রতিনিধিরা। রংপুর ব্যুরোপ্রধান বাদশা ওসমানি, কুড়িগ্রামের আব্দুল্লাহ আল মুজাহিদ, লালমনিরহাটের হাসান উল আজিজ, কুমিল্লার এম হাসান ও শাহ আলম শফি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মফিজুর রহমান লিমন সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারত থেকে আসা মা’\দক ও অস্ত্রের বিষয়ে অনুসন্ধান করেন।
এ সময় তাঁরা দুই সংসদ সদস্য, বিজিবি ও পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা, সাংবাদিক, আইনজীবী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং সাবেক প্রায় ১০ জন মা’\দক কারবারির সঙ্গে কথা বলেন। বিভিন্ন মামলার নথি পর্যালোচনা করেও পাওয়া যায় মা’\দক জব্দ, কারবারিদের আটক এবং পরে জামিনে বেরিয়ে আবার একই কাজে যুক্ত হওয়ার তথ্য।
বালারহাটে সুপারি বাগানের আড়ালে মাদকের ডেরা
কুড়িগ্রামে মা’\দক বিক্রির কয়েকটি স্পট ঘুরে সীমান্তঘেঁষা একটি বাড়ির সন্ধান পাওয়া যায়। ১৭ আগস্ট সন্ধ্যায় ফুলবাড়ী উপজেলার বালারহাট পূর্ব ফুলমতি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, এলাকাটি প্রায় সুনসান। অপরিচিত কাউকে দেখলেই স্থানীয়রা সতর্ক হয়ে ওঠেন। এ কারণে স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর সহযোগিতায় সার ব্যবসায়ীর পরিচয়ে সেখানে যেতে হয়।
সুপারি বাগান পেরিয়ে সেখানে দেখা মেলে একটি আধাপাকা বাড়ির। বাইরে থেকে বাড়িটির ভেতরে কী চলছে, তা বোঝার উপায় নেই। তবে কিছুক্ষণ পরপর মোটরসাইকেলের আনাগোনা এবং কান পাতলে চাপা গুঞ্জন শোনা যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ভারত থেকে আসা বড় বড় চালানের একটি অংশ সরাসরি এই বাড়িতে ঢোকে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই কারবারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন বাড়ির মালিক সাজু মিয়া।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ফুলবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান গোলাম রাব্বানীর হাত ধরে সাজু মিয়ার উত্থান। প্রায় ১৭ বছর ধরে সীমান্ত এলাকার মা’\দক কারবারের নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে ছিল বলে স্থানীয়রা জানান। জুলাই বিপ্লবের পর গোলাম রাব্বানী আত্মগোপনে চলে গেলেও কারবার থামেনি।
স্থানীয়দের দাবি, সাজু মিয়ার বাড়িটি আগেও মা’\দকের ঠিকানা ছিল, এখনো রয়েছে একই অবস্থায়। তবে পৃষ্ঠপোষকতার হাত বদলেছে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব আলী তাঁকে আশ্রয় দিচ্ছেন। আইয়ুব আলীও রাজনৈতিক অবস্থান বদলে এখন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলে ভিড়েছেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
গভীর রাত পর্যন্ত ওই বাড়িতে বেচাকেনা চলার অভিযোগ রয়েছে। সকাল থেকেই দেখা যায় আরেক চিত্র। উপজেলা ও জেলা শহর থেকে মোটরসাইকেলে লোকজন এসে সেখানে জড়ো হন চালান নেওয়ার জন্য। প্রাইভেট কারেও অনেককে সেখানে আসতে দেখা যায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন ভারত থেকে ২০ পেটি গাঁজা ঢোকে। প্রতি পেটিতে ১৩ কেজি হিসাবে দৈনিক পরিমাণ দাঁড়ায় ২৬০ কেজি। এর সঙ্গে আসে ইয়াবা, ফেনসিডিল ও মদের চালানও। স্থানীয়দের দাবি, এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই এখন তিনতলা বাড়ি, তেলের পাম্প ও মার্কেটের মালিক হয়েছেন।
পুরোনো রুট, নতুন নিয়ন্ত্রণ
বালারহাটে যাওয়ার আগে লালমনিরহাটের বিভিন্ন স্পট ঘুরে দেখেন প্রতিবেদক। ভারতের সঙ্গে লালমনিরহাটের প্রায় ২৪৮ কিলোমিটার সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্বে রয়েছে বিজিবি। তারপরও বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে ফেনসিডিল, গাঁজা, মদ ও ইয়াবা আসছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। বিশেষ করে কালীগঞ্জ উপজেলার গোড়ল ও চন্দ্রপুর ইউনিয়নের পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
পতিত আওয়ামী লীগের সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কাশীরাম ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য জিয়াউর রহমান জিয়ার ভাই জাকিরুল ইসলাম ওরফে জাকের কালীগঞ্জ মুন্সির বাজার রোডের অন্যতম মা’\দক কারবারি বলে স্থানীয়দের দাবি। এ ছাড়া একসময় মেমোরি কার্ড ও লোড ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কেউ কেউ পাইকারি মা’\দক কারবার করে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলেও জানা গেছে।
কুড়িগ্রাম জেলায় মা’\দকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) ও বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে, অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযানে উদ্ধার হওয়া মা’\দকের আনুমানিক মূল্য প্রায় এক কোটি টাকা। এ সময় জেলাজুড়ে ১২১ কেজি গাঁজা, ৬ হাজার ৮১১ পিস ইয়াবা, ১ হাজার ৬ বোতল ফেনসিডিল, ২২০ পিস ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট এবং ১৪ গ্রাম হেরোইন জব্দ করা হয়। এসব চোরাচালানের ঘটনায় দায়ের হওয়া ১৭৮টি মামলায় ১৩৭ জন কারবারিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অন্যদিকে লালমনিরহাটে চলতি বছরের বিভিন্ন অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে একাধিক বড় চালান। গত ১৫ আগস্ট বিজিবি-১৫ ব্যাটালিয়নের অভিযানে ২১ লাখ টাকা মূল্যের ৭ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়।
রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি আমিনুল ইসলাম বলেন, পুলিশের পাশাপাশি মা’\দক নির্মূলে মা’\দকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকেও জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-কুমিল্লা হয়ে রাজধানীর পথে
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা, আখাউড়া ও বিজয়নগর উপজেলার প্রায় ৭৩ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় বিজিবির নজরদারি থাকলেও মা’\দকের চোরাচালান থামছে না। মহাসড়কের চেকপোস্টে কিছু চালান ধরা পড়লেও প্রধান চালানগুলো নির্বিঘ্নে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
সরাইল ব্যাটালিয়নের (২৫ বিজিবি) ২০২৫ সালের ১ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৭ আগস্ট পর্যন্ত মাসভিত্তিক জব্দের পরিসংখ্যানেও এর চিত্র পাওয়া যায়। ওই সময়ে বিপুল পরিমাণ মা’\দকদ্রব্য জব্দ করা হয়েছে। জব্দ করা মা’\দকের মোট মূল্য ছয় কোটি ২৬ লাখ টাকার বেশি। এর মধ্যে সর্বোচ্চ এক কোটি ৯ লাখ টাকার মা’\দক জব্দ হয় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল বলেন, অপরাধীরা বেশ শক্তিশালী হওয়ায় পুলিশের পক্ষে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ৫ আগস্টের পর পুলিশের যানবাহন সংকট ও মনোবল কমে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বিজয়নগর এলাকায় আরও দুটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন এবং সদস্য বাড়ানোর বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার শাহ আব্দুর রউফ জানান, মা’\দক কারবারিদের বড় একটি চক্র এখন সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে উল্টো পুলিশের ওপর নজরদারি করে। তবে ইতোমধ্যে সিসি ক্যামেরাসহ তাদের নজরদারির বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে।
জেলা জজ আদালতের পিপি ফখর উদ্দিন আহম্মদ খান বলেন, ছোট মা’\দক কারবারিদের স্থানীয় আদালত থেকে সহজে জামিন না দেওয়া হলেও বড় আসামিরা হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসেন। তাঁর ভাষ্য, ধরা পড়াদের অধিকাংশই ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকার বিনিময়ে পেটের দায়ে বাহক হিসেবে কাজ করেন। মূল কারবারিরা সাধারণত চালানের সঙ্গে থাকেন না।
অন্যদিকে কুমিল্লার ১০৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত এলাকার বিবিরবাজার, গোলাবাড়ী, শশীদলসহ প্রায় ৪৭টি ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট দিয়ে মা’\দক প্রবেশ করছে বলে জানা গেছে।
বিজিবির রিজিওন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইফুল ইসলাম চৌধুরী জানান, গত তিন বছরে কুমিল্লায় বিজিবি ২০ হাজার ২০০টি অভিযান পরিচালনা করে প্রায় ৫২ কোটি টাকার মা’\দকদ্রব্য জব্দ করেছে। এ সময়ে হাতেনাতে ৫২৬ জন আটক হন এবং আড়াই শতাধিক আসামি পলাতক রয়েছেন।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় কুমিল্লায় মা’\দক সহজলভ্য। পুলিশ দিনরাত মা’\দক উদ্ধার ও সেবনকারীদের গ্রেপ্তারে কাজ করছে। এর মধ্যে ১৭ আগস্ট তিন লাখ পিস ইয়াবাসহ দুই কারবারিকে আটক করাকে পুলিশের একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
সাবেক কাউন্সিলর কাজী গোলাম কিবরিয়ার মতে, প্রশাসন ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কুমিল্লায় মা’\দকের কারবার বেড়েছে। তাঁর দাবি, ক্ষমতার পালাবদলের পর নতুন একটি চক্র এখন এই কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে অবৈধ এই কার্যক্রম চলছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে পাওয়া তথ্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জব্দের পরিসংখ্যান, মামলার নথি এবং স্থানীয়দের বক্তব্য মিলিয়ে যে চিত্র সামনে এসেছে, তাতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কারবার বন্ধ হওয়ার বদলে এর নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তনের অভিযোগই বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। পুরোনো রুট ও কৌশলের পাশাপাশি নতুন পৃষ্ঠপোষকতা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং বিকল্প পরিবহন ব্যবহারের মাধ্যমে সীমান্তের এই অবৈধ কারবার আরও জটিল হয়ে উঠছে।

