জানালা দিয়ে ভেসে আসছিল দুই শিশুর কান্না—‘পানি পানি’। জানালার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ছোট ছোট হাত বের করে তারা আকুতি জানাচ্ছিল। ছয়তলা ভবনের পঞ্চম তলা থেকে আসা শিশুদের এমন চিৎকারে থমকে যান পথচারীরা। বারবার একইভাবে পানি চাওয়ার শব্দ এবং অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সন্দেহ হয় স্থানীয়দের। পরে ফ্ল্যাটের বাইরে লাগানো তালা ভেঙে মায়ের লা’শের পাশ থেকে দুই শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
স্থানীয়রা জানান, ফ্ল্যাটটির দরজায় বাইরে থেকে তালা লাগানো ছিল। বাড়ির মালিককে সঙ্গে নিয়ে তারা তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। তখন একটি কক্ষে দুই শিশুকে জীবিত অবস্থায় পাওয়া যায়। পাশের আরেকটি কক্ষে পড়ে ছিল তাদের মা ইসরাত জাহানের লা’শ। পরে জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করা হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লা’শ উদ্ধার করে।
রোববার সকালে জামালপুর শহরের শেখের ভিটা রেলক্রসিং এলাকার একটি ছয়তলা ভবনে এ ঘটনা ঘটে। খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা মৌসুমী আক্তার জানান, সকালে ওই ভবনের পঞ্চম তলা থেকে কয়েকজন পথচারী শিশুদের কান্নার শব্দ শুনতে পান। প্রথমে তারা বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নিলেও পরে বারবার ‘পানি পানি’ বলে চিৎকার এবং জানালার গ্রিলের বাইরে শিশুদের হাত নাড়তে দেখে সন্দেহ করেন। এরপর ভবনের মালিককে বিষয়টি জানানো হয়।
ভবনের মালিক গিয়ে দেখেন, ফ্ল্যাটের দরজা বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। পরে একপর্যায়ে তালা ভেঙে ভেতরে ঢোকা হয়। একটি কক্ষে দুই শিশুকে পাওয়া যায়। ওই কক্ষের দরজাতেও বাইরে থেকে ছিটকিনি লাগানো ছিল।
উদ্ধার হওয়া দুই শিশুর মধ্যে স্নেহার বয়স ১০ বছর এবং মমিন শাহরিয়ারের বয়স পাঁচ বছর। পুলিশ জানিয়েছে, তারা ইসরাত জাহানের আগের স্বামী কাউসার আহাম্মেদ শাওনের সন্তান।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ইসরাত জাহান শেরপুরের শ্রীবরদী এলাকার মৃত ইসমাইল হোসেনের মেয়ে। তার আগের স্বামী কাউসার আহাম্মেদ শাওন মারা যাওয়ার পর তিনি গোপনে এক ব্যক্তিকে বিয়ে করেন বলে পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে পুলিশ। এরপর ওই ব্যক্তিকে নিয়ে জামালপুর শহরের শেখের ভিটা এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন তিনি।
তবে ইসরাত জাহানের বর্তমান স্বামীর নাম-পরিচয়, ঠিকানা কিংবা কত দিন ধরে তারা ওই ফ্ল্যাটে বসবাস করছিলেন—এসব বিষয়ে বাড়ির মালিক কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
ঘটনার পর থেকে ইসরাতের বর্তমান স্বামী পলাতক রয়েছেন বলে স্থানীয়দের ধারণা। ফলে তার ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের কেউ কেউ ধারণা করছেন, দাম্পত্য কলহের জেরে ইসরাত জাহানকে হ’ত্যা করে তার স্বামী পালিয়ে যেতে পারেন। তবে এটি এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য নয়। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তেও এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয়নি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্ত ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পরই স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ ফ্ল্যাটটি ঘুরে দেখে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে। উদ্ধার করা দুই শিশুকে নিরাপদ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তাদের কাছ থেকেও ঘটনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুস সাকিব বলেন, ‘ঘটনাস্থলে পৌঁছে লা’শ উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক সুরতহাল শেষে তদন্তের জন্য লা’শ জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। মৃ’ত্যুর কারণ উদ্ঘাটনের পাশাপাশি ওই গৃহবধূর বর্তমান স্বামীর পরিচয় ও তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’


