হরমুজ সংকটে নভেম্বর পর্যন্ত কাতারের এলএনজি সরবরাহ স্থগিত, চাপে বাংলাদেশ

হরমুজ প্রণালির চলমান যুদ্ধ ও নিরাপত্তা সংকটের কারণে বাংলাদেশে এলএনজি বা প্রাকৃতিক গ্যাস পাঠাতে আরও বিলম্ব করছে কাতারএনার্জি। সেপ্টেম্বর মাস পার হয়ে গ্যাস সরবরাহ স্থগিত রাখার মেয়াদ আগামী নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারত, পাকিস্তানসহ ইউরোপের বহু দেশও কাতারের গ্যাস না পাওয়ায় বড় ধরনের জ্বালানি সংকটের মুখে পড়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত গ্যাস রপ্তানি শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে কাতার। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। ফলে কাতারএনার্জিও স্বাভাবিকভাবে এলএনজি রপ্তানি চালিয়ে যেতে পারছে না।

গত মার্চেই কাতারএনার্জি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছিল। যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান না হওয়ায় এরপর প্রতি মাসেই স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। এবারও সেপ্টেম্বরের পর সরবরাহ স্থগিত রাখার সময়সীমা বাড়িয়ে নভেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে।

জানা গেছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর প্রথম ছয় মাসে কাতার মাত্র ১৮টি এলএনজিবাহী জাহাজ পাঠাতে পেরেছে। অথচ গত বছরের একই সময়ে এই পথে ৫০৯টি জাহাজ চলাচল করেছিল। এতে কাতারের প্রায় ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের বাণিজ্য ক্ষতি হয়েছে।

শুধু বাংলাদেশ নয়, একই সংকটে পড়েছে দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপ

ইতালির এডিসন কোম্পানি জানিয়েছে, তাদের নির্ধারিত পাঁচটি এলএনজি চালান বাতিল হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকেও একই ধরনের নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের মতো দেশগুলোর ওপর। কারণ এসব দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় কাতারের গ্যাসের ওপর দীর্ঘদিন ধরেই উল্লেখযোগ্য নির্ভরতা রয়েছে। এখন কাতার থেকে সরবরাহ বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজার থেকে চড়া দামে বিকল্প উপায়ে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। এতে দেশগুলোর ওপর তৈরি হচ্ছে বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মালয়েশিয়া নিজেদের উৎপাদন বাড়িয়ে বৈশ্বিক বাজারের ঘাটতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে কাতারের সরবরাহে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

বিশ্ব এলএনজি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ

বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলএনজি পরিবাহিত হয় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে। ফলে এই সমুদ্রপথে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হওয়ায় শুধু কাতারের রপ্তানি নয়, বৈশ্বিক গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাতেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।

নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কাতার তাদের গ্যাস রপ্তানি স্বাভাবিক করতে পারছে না। ফলে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি কবে স্থিতিশীল হবে, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করছে কাতারের এলএনজি সরবরাহ পুনরায় শুরু হওয়ার বিষয়টি।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, সংকট কাটতে সময় লাগতে পারে

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, সমুদ্রপথ নিরাপদ ঘোষণা করার পরও কাতারের এলএনজি উৎপাদন ও সরবরাহ পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে অন্তত দুই মাস সময় লাগতে পারে।

আর হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্যাস কারখানাগুলো পুরোপুরি মেরামত করে স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে ৩ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। এর ফলে বিশ্ব গ্যাসের বাজারেও দ্রুত স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসার সম্ভাবনা কম।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতির প্রভাব দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব গ্যাসের বাজারে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। এর মধ্যে কাতারের সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন বাংলাদেশসহ গ্যাস আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য বাড়তি জ্বালানি ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।

সূত্র: ইউরো নিউজ।