দুবাই থেকে মুক্তির পর বেনজীর কোথায়, জানতে ইন্টারপোলকে চিঠি পুলিশের

সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছিল দেশটির পুলিশ। প্রায় চার মাস পেরিয়ে গেলেও তাকে এখনও দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে তার বর্তমান অবস্থান জানতে বুধবার আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলকে ই-মেইলে চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) থেকে চিঠিটি পাঠানো হয়েছে বলে একাধিক পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।

ইন্টারপোলের প্রতিটি সদস্য দেশে একটি করে নিজস্ব কার্যালয় থাকে, যা ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো বা এনসিবি নামে পরিচিত। সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ইন্টারপোলের মূল কার্যালয়ের মধ্যে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম এই এনসিবি। বাংলাদেশে এনসিবির মূল কার্যালয় রয়েছে পুলিশ সদরদপ্তরে।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বিষয়টি জানতে চাইলে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের অবস্থান সম্পর্কে জানতে এনসিবির মাধ্যমে বুধবার একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠির উত্তর পাওয়ার পর পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।

কেন আবার চিঠি পাঠানো হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, কেউ কেউ বলছেন সাবেক আইজিপি দুবাই ছেড়ে চলে গেছেন। সে কারণেই তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে বিষয়টি জানতে চাওয়া হয়েছে।

জুনে দুবাইয়ে বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গে সংসদে ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানিয়েছিলেন, বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক চ্যানেলে যোগাযোগ করে দ্রুত বাংলাদেশে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি বাংলাদেশ পুলিশের একটি ঐতিহাসিক সাফল্য। এর মাধ্যমে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ তৈরি হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে জাতিকে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। তার মতে, এ ঘটনা দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।

বেনজীরকে গ্রেপ্তারের পর তার নথিপত্র চেয়ে বাংলাদেশকে চিঠি পাঠায় দুবাই পুলিশ। দুবাইয়ের আইন অনুযায়ী, ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সেই চিঠির জবাব দেওয়ার কথা। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগকারী পুলিশের এনসিবি শাখা পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করে। বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক চ্যানেলে নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই প্রয়োজনীয় নথিপত্র পাঠানো হয়।

যেসব মামলার কারণে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারি হয়েছিল, সেসব মামলার প্রাথমিক নথিপত্র পর্যালোচনার পর ঢাকার সঙ্গে আবার যোগাযোগ করে দুবাই পুলিশ। বন্দি প্রত্যর্পণের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও কারিগরি বিষয় নিয়ে আরও বেশ কিছু তথ্য-উপাত্ত চাওয়া হয়। ঢাকা থেকেও সেসব নথিপত্র পাঠানো হয়। এরপর সরকারের প্রত্যাশা ছিল, দুবাই থেকে বেনজীরকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। কিন্তু এর মধ্যেই ২৭ জুলাই আরব আমিরাতের একটি আদালত তার জামিন মঞ্জুর করে। পরে আদালতের ওই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মুক্তি পাওয়ার পর বেনজীর আহমেদ ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র সেন্ট লুসিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন। ফলে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় আটকে পড়েছে কি না, সেই প্রশ্নও এখন সামনে এসেছে।

ইন্টারপোলের সঙ্গে সমন্বয়কারী এনসিবি শাখায় কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে—এমন একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা সমকালকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে তিনটি দেশের বন্দিবিনিময় চুক্তি রয়েছে। দেশগুলো হলো ভারত, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা। তবে আরব আমিরাতের সঙ্গে বাংলাদেশের এ ধরনের কোনো চুক্তি নেই। অবশ্য বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও অতীতে বিভিন্ন সময়ে আরব আমিরাত থেকে আসামি বা বন্দি দেশে ফিরিয়ে আনার একাধিক নজির রয়েছে বাংলাদেশের। মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসট্যান্স বা এমএলএ—অর্থাৎ পারস্পরিক আইনি সহায়তার মাধ্যমে পলাতক অপরাধীকে আইনি প্রক্রিয়ায় নিজ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

দুর্নীতি, মানবতাবিরোধী অপরাধসহ একাধিক মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদকে কোন প্রক্রিয়ায় ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হবে, সেই প্রশ্নই ঘুরেফিরে সামনে আসছে। আইনজীবীদের মতে, সাবেক এই শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাকে দেশে ফেরানোর বিষয়টি মূলত চারটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। এগুলো হলো—অপরাধের বিষয়ে উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, দুই দেশের আইনের সামঞ্জস্যতা, আদালতে তথ্য উপস্থাপন এবং কূটনৈতিক তৎপরতা।

জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ ও পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ছয়টি মামলা করেছে দুদক। এর বাইরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলাতেও তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ ও পাসপোর্ট জালিয়াতির মামলায় সাবেক আইজিপির বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির জন্য বাংলাদেশ পুলিশের মাধ্যমে ইন্টারপোলের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। ওই মামলাতেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

একাধিক কর্মকর্তা জানান, সর্বশেষ চলতি বছরের ৭ মে ইন্টারপোলের সহায়তায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে হত্যা মামলার আসামি আরিফ সরকারকে দেশে ফিরিয়ে আনে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তাদের ভাষ্য, আরিফ সরকার নরসিংদীর শিবপুর উপজেলা চেয়ারম্যান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হারুন অর রশিদ খান হ’\ত্যা মামলার আসামি। এর আগে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে একই মামলার আরেক আসামি মহসিন মিয়াকেও ইন্টারপোলের সহায়তায় দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে গ্রেপ্তারের পরও অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীকে তার নিজ দেশে ফেরানো সম্ভব হয় না। এ ক্ষেত্রে নিজ দেশের নাগরিকত্ব অস্বীকার করে অন্য দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ এবং ভিন্ন দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করার কারণে পলাতক অপরাধীদের দেশে ফেরানো আরও চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে। সূত্রের দাবি, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ একাধিক দেশের নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট গ্রহণ করেছেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতেও তার বিনিয়োগ রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

তবে বেনজীর আহমেদের বর্তমান অবস্থান কিংবা তাকে দেশে ফেরানোর বিষয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ বা বেনজীর আহমেদের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তথ্যসূত্র: সমকাল