নামের সঙ্গে যেন মিলে গেল কীর্তি—‘রাজা’। ইংলিশ ব্যাটারদের সামনে অভিষেকেই মোহাম্মদ রাজাউল্লাহ রীতিমতো রাজত্ব করেছেন। তবে বল হাতে চমক দেখানোর পর ব্যাট হাতে তিনি যা করে দেখালেন, সেটি ছাড়িয়ে গেল আগের সবকিছুকেই। এমন একাধিক কীর্তি গড়েছেন এই পাকিস্তানি পেসার, যা টেস্ট ক্রিকেটের ১৪৯ বছরের ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি।
প্রথম ইনিংসে বোলিং করতে নেমে একে একে ৪টি উইকেট তুলে নিয়েছিলেন রাজাউল্লাহ। গতির ঝড়ের সঙ্গে উইকেট তুলে নেওয়ার সামর্থ্য দেখিয়ে অভিষেকেই আলোচনায় উঠে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু তখনও কে জানত, আরও বড় বিস্ময় লুকিয়ে রেখেছেন তার ব্যাটের আড়ালে!
দলের দ্বিতীয় ইনিংসে যখন ব্যাট হাতে নামলেন রাজাউল্লাহ, তখন পাকিস্তানের ইনিংস ব্যবধানে হার এড়াতে প্রয়োজন ছিল মাত্র ২ রান। শুনতে খুব বড় কোনো বিষয় নয়। কিন্তু টেলএন্ডারদের তখনো ২টি উইকেট বাকি—এই বিষয়টি মাথায় রাখলে পরিস্থিতিটা অন্যরকম মনে হয়। অর্থাৎ, পাকিস্তানের ইনিংসের যবনিকাটা তখন যেন স্রেফ দুটি ইয়র্কারের অপেক্ষায়!
কিন্তু পাক ইনিংসের সেই যবনিকাকে মাত্র দুটি ইয়র্কারের ব্যাপার হতে দেননি রাজাউল্লাহ। জশ টাংকে ছক্কা মেরে শুরু করেন নিজের ইনিংস। আর সেই ছক্কাতেই পাকিস্তান এড়ায় ইনিংস ব্যবধানে হার।
এরপর শুরু হয় রাজাউল্লাহর ‘শো’। সব মিলিয়ে ৯টি ছক্কা হাঁকিয়েছেন তিনি। মাত্র ৪৩ বলে পূর্ণ করেন ফিফটি। অভিষেকে পাকিস্তানের হয়ে এর চেয়ে দ্রুত ফিফটির নজির আর নেই। শেষ পর্যন্ত ৬৩ বলে ৮১ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলে থামেন এই ব্যাটার।
তার এই ইনিংস পাকিস্তানকে শুধু ইনিংস ব্যবধানে হারের লজ্জা থেকেই রক্ষা করেনি, বরং ১২৯ রানের লিড এনে দিয়ে জয়ের ক্ষীণতর একটি আশাও জাগিয়ে তুলেছে।
পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত কী করে, সেটি অবশ্য সময়ই বলে দেবে। তবে তৃতীয় দিনে রাজাউল্লাহ যা করে দেখিয়েছেন, তাতেই নিজের নাম তুলে নিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়।
অভিষেকে ৯টি ছক্কা—এমন কীর্তি ক্রিকেট ইতিহাসে এর আগে দেখা গেছে মাত্র একবার। ২০০৮ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অভিষেক টেস্টে নিউজিল্যান্ডের টিম সাউদি হাঁকিয়েছিলেন সমান ৯টি ছক্কা। তবে সেই ম্যাচটি হয়েছিল নেপিয়ারে, নিউজিল্যান্ডের ঘরের মাঠে। প্রতিপক্ষের মাঠে অভিষেকে ৯ ছক্কার এমন নজির টেস্ট ক্রিকেটের ১৪৯ বছরের ইতিহাসে আর কখনো দেখা যায়নি।
আরও মজার ব্যাপার হলো, রাজাউল্লাহর এই অনন্য কীর্তির সাক্ষী ছিলেন সেই টিম সাউদিই। অবসর নেওয়া এই কিউই পেসার বর্তমানে ইংল্যান্ড দলের পরামর্শক হিসেবে এজবাস্টনে উপস্থিত আছেন। ফলে তার নিজের রেকর্ডের একটি অনন্য সংস্করণ চোখের সামনেই দেখলেন সাউদি।
ছক্কার রেকর্ড এসেছে জুটিতেও। মোহাম্মদ আব্বাসের সঙ্গে রাজাউল্লাহর জুটিতে এসেছে মোট ১০টি ছক্কা। ক্রিকেট ইতিহাসে শেষ তিন ব্যাটার মিলে এর আগে কখনো এতগুলো ছক্কা হাঁকাতে পারেননি। টেলএন্ডারদের ব্যাটিং যেখানে সাধারণত টিকে থাকার লড়াই, সেখানে রাজাউল্লাহ ও আব্বাস মিলে সেটাকেই পরিণত করেছেন ছক্কার উৎসবে।
আরও একটি রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছেন রাজাউল্লাহ। ইংল্যান্ডের মাটিতে এক টেস্ট ইনিংসে ৯টি ছক্কা হাঁকানোর নজির গড়েছিলেন হ্যারি ব্রুক। ২০২৩ অ্যাশেজে লর্ডসে ১৫৫ রানের ইনিংস খেলার পথে তিনি এই রেকর্ড করেছিলেন। গতকাল সেই রেকর্ডেও ভাগ বসালেন রাজা।
বল হাতে ৪ উইকেট, এরপর ব্যাট হাতে ৬৩ বলে ৮১ রান—অভিষেক টেস্টের তৃতীয় দিনটিকে তাই নিজের করে নিয়েছেন মোহাম্মদ রাজাউল্লাহ। নামের মতোই যেন প্রতিপক্ষের মাঠে রাজত্ব করেই ইতিহাসে জায়গা করে নিলেন পাকিস্তানের এই তরুণ।


