সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে ঢাকা সেনানিবাসের বাসা থেকে উচ্ছেদে তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি—আসামিপক্ষের আইনজীবীর জেরায় এমনটাই দাবি করেছেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া। শতাধিক মানুষকে গু’\ম ও খু’\নের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি। পরে আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল গনি দীর্ঘ জেরায় তাকে একের পর এক প্রশ্নের মুখে ফেলেন।
রোববার টানা তৃতীয় দিনের জেরায় জিয়াউলের আইনজীবী প্রশ্ন তোলেন, কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল থাকাকালে বেগম জিয়াকে সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সব কার্যক্রম তিনিই গ্রহণ করেছিলেন কি না। জবাবে ইকবাল করিম বলেন, এ কথা সত্য নয়; ওই সময় তিনি বিদেশে অবস্থান করছিলেন।
জেরার একপর্যায়ে গনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পে যুক্ত করে সেনাবাহিনীকে দুর্নীতিগ্রস্ত করা হয়েছে—এ বিষয়ে ইকবাল করিম মিথ্যা বলেছেন। সাবেক সেনাপ্রধান তার জবাবে বলেন, অভিযোগটি অসত্য। এরপর প্রশ্ন ওঠে, তিনি সেনাপ্রধান থাকাকালে যারা গু’\ম হয়েছিল, তাদের উদ্ধারে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছিলেন কি না। উত্তরে তিনি বলেন, এটি তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ত না। কে কোথায় গু’\ম হয়েছে, সে বিষয়ে তার কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছিল না; সামরিক গোয়েন্দা পরিদপ্তরও নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেয়নি। তবে গু’\মের ঘটনা ঘটছে—এমন বার্তা তিনি পেয়েছিলেন।
গনি জানতে চান, গু’\মের সংস্কৃতি বন্ধে তিনি কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছিলেন কি না এবং সে সংক্রান্ত কোনো লিখিত প্রমাণ রয়েছে কি না। ইকবাল করিমের ভাষ্য, তিনি অসংখ্য পদক্ষেপ নিয়েছেন, তবে লিখিত কোনো প্রমাণপত্র তার কাছে নেই।
আরেক প্রশ্নে গনি বলেন, র্যাব থেকে প্রত্যাবর্তনের পর এক কনিষ্ঠ কর্মকর্তা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দুজনকে হ’\ত্যা করার কথা স্বীকার করেছিলেন—এমন তথ্যের ভিত্তিতে তিনি কোনো আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছিলেন কি না। জবাবে ইকবাল করিম বলেন, তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি; কারণ তার কাছে এ বিষয়ে কোনো সাক্ষী বা আলামত ছিল না। একইভাবে এক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ছয়জনকে হ’\ত্যা করার কথা স্বীকার করেছিলেন বলে উল্লেখ করে তার নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, নাম কামরুল; তবে ঘটনার তারিখ তার মনে নেই।
জেরায় আরও জানতে চাওয়া হয়, সেনাপ্রধান হিসেবে সেনাবাহিনীর ওপর তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল কি না। উত্তরে তিনি বলেন, তার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ছিল, কিন্তু অপারেশনাল কন্ট্রোল ছিল না। র্যাবে নিয়োজিত সেনা সদস্যদের অপরাধসংক্রান্ত কোনো প্রতিবেদন সেনা সদরে এসেছে কি না—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, সেনা সদরে এসেছে কি না জানেন না, তবে তার কাছে আসেনি।
গনি প্রশ্ন করেন, সেনাপ্রধান থাকাকালে জিয়াউল আহসানের সঙ্গে তার কখনো সাক্ষাৎ হয়েছে কি না। জবাবে তিনি বলেন, হয়নি; তিনি সুযোগ দেননি। জিয়াউল জুনিয়র কর্মকর্তা ছিলেন এবং এত জুনিয়র কর্মকর্তার সঙ্গে সেনাপ্রধানের সাক্ষাৎ করার রীতি নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি। জিয়াউলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগে তাকে কখনো তলব করে কৈফিয়ত চাওয়া হয়েছিল কি না—এ প্রশ্নে তার জবাব ছিল, না। তখন গনি অভিযোগ তোলেন, ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে তিনি জিয়াউলের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। ইকবাল করিম এই অভিযোগও সরাসরি অস্বীকার করেন।
জেরার আরেক পর্যায়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল জুলফিকার আলী মজুমদারের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার তালছায়া গ্রামে আহমেদ সোবা ফকিরের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ২ কোটি ৭ হাজার টাকা লুটের অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। দাবি করা হয়, এ বিষয়ে জিয়াউল সামরিক গোয়েন্দা দপ্তরে প্রতিবেদন দাখিল করেছিলেন এবং তদন্ত ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে ইকবাল করিম তাকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। জবাবে তিনি বলেন, এ কথাও সত্য নয়; তিনি এমন কোনো প্রস্তাব দেননি।
ডিওএইচএসে তার বাসা অন্যদের তুলনায় এককাঠা বেশি জমিতে স্থাপিত—এমন অভিযোগেরও জবাব দেন তিনি। বলেন, অন্যদের পাঁচ কাঠা হলেও তাকে দেওয়া হয়েছে ৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ জমি।
আরেক প্রশ্নে গনি বলেন, সেনাপ্রধান থাকার সময় থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত হাসিনা সরকারের অন্যায় সুবিধা নিয়ে তিনি সম্পদ কয়েকগুণ বৃদ্ধি করেছেন। জবাবে জেনারেল ইকবাল বলেন, এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।
সবশেষে গনি অভিযোগ করেন, সেনাপ্রধান হিসেবে তার দেওয়া জবানবন্দিতে সেনাবাহিনীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে। ইকবাল করিমের জবাব—এ কথাও সত্য নয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (International Crimes Tribunal)-১-এ মামলাটির বিচার চলছে। বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনালে আরও রয়েছেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
