‘সমাজে মাদক থাকবে না’—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে নতুন অভিযানে সরকার

দেশকে মা’\দক’\মুক্ত করার প্রত্যয়ে নতুন সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে ইতোমধ্যে মা’\দকের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। নতুন আইজিপি আলী হোসেন ফকির স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ—‘সমাজে মা’\দক থাকবে না।’ এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছে বলেও জানান তিনি।

মা’\দকের বিরুদ্ধে নতুন সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাচ্ছেন সচেতন মহল। দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অভিভাবক সমাজ তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠায় ছিলেন। বিভিন্ন ধরনের মা’\দকদ্রব্যে আসক্ত হয়ে পড়ছিল তরুণরা; পরিবারগুলো নীরবে ভেঙে পড়ছিল। ফলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কঠোর পদক্ষেপের দাবি জোরালো হচ্ছিল।

বর্তমানে মা’\দকাসক্তি বাংলাদেশে এক গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছে মা’\দকের বিষবাষ্প। আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে মা’\দকাসক্ত মানুষের সংখ্যা, যার বড় অংশই তরুণ প্রজন্ম। নীরব ঘাতকের মতো মা’\দকের এই সর্বগ্রাসী বিস্তার এখন একটি জটিল সামাজিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে।

মা’\দকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহায়তায় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (Bangladesh Medical University) গত জানুয়ারি মাসে দেশব্যাপী মা’\দক পরিস্থিতি নিয়ে একটি জরিপ চালায়। সেই জরিপে উঠে আসে উদ্বেগজনক তথ্য—বাংলাদেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ মা’\দকে আসক্ত, যা মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এদের মধ্যে ৯২ শতাংশ মা’\দকসেবীর বয়স ৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে, অর্থাৎ বিপুল অংশই তরুণ। মা’\দকাসক্তদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৭৭ দশমিক ৬ লাখ এবং নারী ২ দশমিক ৮৫ লাখ। দেশে বর্তমানে প্রায় ২৭ ধরনের মা’\দক ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ১৮ ধরনের মা’\দক নিয়মিত সেবন করা হয়।

প্রচলিত মা’\দকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় গাঁজা, ইয়াবা (মেথামফেটামিন) ও ফেনসিডিল। এছাড়া আইস (ক্রিস্টাল মেথ), এলএসডি, ডিএমটি, ম্যাজিক মাশরুম ও খাটের ব্যবহারও রয়েছে। ইনজেকশন ও ট্যাবলেট আকারে ব্যবহৃত মা’\দকের মধ্যে রয়েছে হেরোইন, বুপ্রেনরফিন ইনজেকশন, টাপেন্ডাডল এবং বিভিন্ন ধরনের ঘুমের ওষুধ। কোকেন ও এমডি এমবি তুলনামূলক ব্যয়বহুল; এগুলো মূলত উচ্চবিত্তদের মধ্যে ব্যবহৃত হয় এবং অনেক সময় ট্রানজিট হিসেবেও ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপে আরও উল্লেখ করা হয়, বেকার জনগোষ্ঠীর মধ্যে—প্রায় ২৯ শতাংশ—মা’\দকাসক্তির হার বেশি। এরপর রয়েছে পরিবহন শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দিনমজুর শ্রেণি। মা’\দকাসক্তদের একটি বড় অংশ মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়া তরুণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থী ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যয়বহুল মা’\দক যেমন আইস বা এলএসডি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণিতে গাঁজা ও ইয়াবার ব্যবহার বেশি দেখা গেলেও উচ্চবিত্তদের মধ্যে কোকেন, এলএসডি ও বিদেশি মদের ব্যবহার তুলনামূলক বেশি।

জরিপ বলছে, প্রায় ৬০ শতাংশ তরুণ কৌতূহলবশত বন্ধুবান্ধবের প্রভাবে প্রথম মা’\দক গ্রহণ করে। এরপর ধীরে ধীরে তৈরি হয় নির্ভরশীলতা। ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব, পারিবারিক কলহ ও মানসিক হতাশাও মা’\দকসেবনের পেছনে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। মা’\দকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, একজন আসক্ত ব্যক্তি বছরে গড়ে তার পরিবারের প্রায় ৭২ হাজার টাকা মা’\দকের পেছনে ব্যয় করে—যা অনেক পরিবারের জন্য মারাত্মক অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে।

নতুন সরকারের উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে এই ভয়াবহ বাস্তবতা বদলাতে পারে, তা সময়ই বলবে। তবে রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার ও মাঠপর্যায়ের কঠোর প্রয়াস যদি সমন্বিত হয়, তাহলে মা’\দকের এই বিস্তার রোধে একটি নতুন অধ্যায় সূচিত হতে পারে—এমন প্রত্যাশাই এখন সবার।