আমরা এখন পবিত্র রমজান মাসের বিদায় লগ্নে উপনীত। সিয়াম-কিয়াম, রোজা ও তারাবির এই বরকতময় মাস শেষ হতে চলেছে। তবে রমজান শেষ হয়ে গেলেও একজন মুমিনের আমল কখনো শেষ হয় না। মানুষের জীবনে ইবাদতের ধারাবাহিকতা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আপনি আপনার প্রভুর ইবাদত করুন, আপনার মৃত্যু আসা পর্যন্ত।’ (সুরা হিজর : ৯৯)। অর্থাৎ মানুষের জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইবাদত ও নেক আমলের পথ খোলা থাকে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে বলেছেন, ‘মানুষ যখন মৃত্যুবরণ করে, তখন তার আমল বন্ধ হয়ে যায়।’ (তিরমিজি : ১৩৭৬)। এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, মানুষের আমল কেবল মৃত্যুর মাধ্যমেই শেষ হয়। সুতরাং রমজান মাসের রোজা শেষ হলেও একজন ঈমানদারের নেক আমল থেমে থাকবে না।
রমজানের পরও রয়েছে রোজা রাখার বিশেষ ফজিলতপূর্ণ সুযোগ। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানে সিয়াম পালন করবে, অতঃপর শাওয়ালের আরো ছয়টি সিয়াম পালন করবে, সে সারা বছর সিয়াম রাখার সমতুল্য সওয়াবপ্রাপ্ত হবে।’ (মুসলিম : ১১৬৪)।
এছাড়া প্রতি মাসেই রয়েছে তিনটি করে নফল রোজা রাখার সুযোগ। এ সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেন, ‘প্রতি মাসে তিনটি এবং এক রমজানের পর পরবর্তী রমজান পর্যন্ত সিয়াম পালন করা সারা বছর সিয়াম পালনের সমান।’ (মুসলিম : ১১৬২)।
সাপ্তাহিকভাবেও রয়েছে বিশেষ ফজিলতের রোজা। নবীপত্নী আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘রাসুল (সা.) সপ্তাহে সোম ও বৃহস্পতিবার সিয়াম পালন করার ব্যাপারে যত্নবান ছিলেন।’ (তিরমিজি : ৭৪৫)।
রমজান শেষে তারাবির নামাজ শেষ হলেও রাতের নফল ইবাদত বন্ধ হয়ে যায় না। বরং সারা বছরই তাহাজ্জুদ নামাজ অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি সুন্নত ইবাদত। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম সালাত হলো রাতের (তাহাজ্জুদ) সালাত।’ (মুসলিম : ১১৬৩)।
রমজানের মতো সারা বছরই শেষ রাতে দোয়া ও প্রার্থনার বিশেষ সুযোগ রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহতায়ালা প্রতি রাতে শেষ তৃতীয়াংশে প্রথম আসমানে অবতীর্ণ হয়ে বলেন—আছে কেউ আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? আছে কেউ আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব? আছে কেউ আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব।’ (বোখারি : ১১৪৫)।
এছাড়াও প্রতিদিন আদায় করা যায় ১২ রাকাত সুন্নতে মুয়াক্কাদা নামাজ। যার মধ্যে রয়েছে—জোহরের আগে ৪ রাকাত ও পরে ২ রাকাত, মাগরিবের পর ২ রাকাত, ইশার পর ২ রাকাত এবং ফজরের আগে ২ রাকাত।
উম্মে হাবিবা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি—‘যদি কোনো মুসলিম বান্দা ফরজ ছাড়া প্রতিদিন ১২ রাকাত সুন্নত নামাজ আদায় করে, তবে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করেন।’ (মুসলিম : ৭২৮)।
এছাড়াও রয়েছে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর বিভিন্ন জিকির ও দোয়া। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘অতঃপর যখন তোমরা নামাজ সম্পন্ন কর, তখন দণ্ডায়মান, উপবিষ্ট ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ কর।’ (সুরা নিসা : ১০৩)।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৩ বার আল্লাহু আকবার—মোট ৯৯ বার পাঠ করবে এবং সবশেষে ১০০ পূর্ণ করতে বলবে— “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়্যিন কাদির”, তার গুনাহ যদি সমুদ্রের ফেনার মতোও হয়, আল্লাহ তা মাফ করে দেবেন।’ (মুসলিম : ৫৯৭)।
রমজান শেষ হলেও তাই একজন মুমিনের ইবাদত ও নেক আমলের পথ শেষ হয়ে যায় না। বরং এই মাসে অর্জিত তাকওয়া ও ইবাদতের অভ্যাস সারা বছর ধরে বজায় রাখাই একজন প্রকৃত ঈমানদারের পরিচয়।


