ড. মুহাম্মদ ইউনূস (Muhammad Yunus)-এর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ এবং ‘গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫’-কে ‘সম্পূর্ণ বেআইনি ও অবৈধ’ বলে মন্তব্য করেছে সরকারি দল বিএনপি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ (Salahuddin Ahmed) বলেছেন, এই আদেশ ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল’ এবং এর কোনো আইনি বৈধতা নেই।
জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালী বিধির ৬২ বিধির অধীনে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান (Shafiqur Rahman)-এর আনা মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ মন্তব্য করেন।
সংসদে বক্তব্যে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিলের পর রাষ্ট্রপতির এ ধরনের আদেশ জারির কোনো ক্ষমতা ছিল না। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যে আদেশের জন্মই বৈধ নয়, সেটি কীভাবে কার্যকর হতে পারে?” তার ভাষায়, এই আদেশ ‘ভয়েড অ্যাব ইনিশিও’—অর্থাৎ সূচনা থেকেই বাতিল।
গণভোটের প্রক্রিয়া নিয়েও কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, চারটি প্রশ্ন একত্রে দিয়ে জনগণকে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে, যা জনগণের মতামতকে প্রভাবিত করার শামিল। তিনি এটিকে “কলার ভেতরে তিতা ওষুধ ঢুকিয়ে খাওয়ানোর মতো” বলেও উল্লেখ করেন।
সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ গ্রহণ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ করেন তিনি। তার মতে, অস্তিত্বহীন কোনো পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার বিধান নেই এবং এ ক্ষেত্রে প্রধান নির্বাচন কমিশনার তার এখতিয়ার অতিক্রম করেছেন।
বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি বলেন, দলটি সংস্কারের বিরুদ্ধে নয়; বরং রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে একটি গ্রহণযোগ্য সংবিধান সংশোধন চায়।
পরবর্তীতে সংসদে তিনি একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যাতে সরকারি দল, বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের আহ্বান জানানো হয়। এই প্রস্তাব স্পিকার কণ্ঠভোটে দিলে তা গৃহীত হয়।
অন্যদিকে, বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য ছিল দেশে যেন আর কখনো ফ্যাসিবাদ ফিরে না আসে। তিনি অতীতের ভোটাধিকার হরণ, গুম ও হ’\ত্যার ঘটনাগুলোর সমালোচনা করে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের ওপর জোর দেন।
তিনি আরও বলেন, বহুদলীয় গণতন্ত্র থাকা সত্ত্বেও একসময় একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, যা জনগণের ভোটের মূল্য কমিয়ে দেয়। সাম্প্রতিক সময়ের নির্বাচনের সমালোচনা করে তিনি দাবি করেন, জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী গণতান্ত্রিক কাঠামো পুনর্গঠন জরুরি।
সংসদে আলোচনায় অংশ নিয়ে আন্দালিব রহমান পার্থ (Andalib Rahman Partho) সংবিধান ‘ছুড়ে ফেলা’র ধারণার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, সংবিধান পরিবর্তন করা যেতে পারে, কিন্তু সম্পূর্ণ বাতিল করা উচিত নয়।
তার বক্তব্যের জবাবে সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, সংবিধান আংশিকভাবে মানা বা অমানা ‘সুযোগসন্ধানী’ আচরণ। তিনি খালেদা জিয়ার বক্তব্য তুলে ধরে সংবিধান পরিবর্তনের প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন।
এদিকে এনসিপির আখতার হোসেন প্রশ্ন তোলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman) নিজে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের আহ্বান জানালেও এখন কেন সেই রায় মেনে নিতে অনীহা দেখা যাচ্ছে।
সামগ্রিক আলোচনার পর সংসদে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে নতুন সংশোধনী প্রণয়নে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
